একদিন বৃষ্টি, পরদিনই আবার তীব্র গরম। কখনো টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হচ্ছে সিলেট, আবার হঠাৎ শুরু হচ্ছে শুষ্ক আবহাওয়া। গত কয়েক বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সিলেট অঞ্চলের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। এর প্রভাব পড়ছে হাওর, মাটি ও কৃষিতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, দ্রুত নগরায়ণ ও অতিরিক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে। গত তিন দশকে ভূমি ব্যবহারে বড় ধরনের পরিবর্তন সিলেটের প্রতিবেশব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে এবং জলবায়ুর চরম পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা কমিয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে সিলেটের গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সিলেটের গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৩ দশমিক ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
একইভাবে বেড়েছে বৃষ্টিপাতও। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সিলেটে বছরে গড় বৃষ্টিপাত ছিল ৩ হাজার ৮০৮ মিলিমিটার। আর ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গড় বৃষ্টিপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬২৭ মিলিমিটারে।
বৃষ্টিপাতের সময়কালেও পরিবর্তন এসেছে। জুন, জুলাই ও আগস্টকে বর্ষার প্রধান মাস হিসেবে ধরা হলেও বর্ষা শুরুর আগেই এখন ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে।
চলতি বছর সিলেটে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে ১ হাজার ৮৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এরপর জুন ও জুলাইয়ে হয়েছে ১ হাজার ৭৭৪ মিলিমিটার। অর্থাৎ বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই এ অঞ্চলে মোট ৩ হাজার ৬১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
আবহাওয়া অফিস বলছে, নদ-নদীগুলো আগে থেকেই পানিতে পরিপূর্ণ থাকায় সিলেট ও পার্শ্ববর্তী মেঘালয়ে আরও বৃষ্টিপাত হলে বন্যা সৃষ্টি হতে পারে।
‘হিট আইল্যান্ডে’ পরিণত হচ্ছে সিলেট
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সবুজায়ন কমে যাওয়া এবং দ্রুত নগর সম্প্রসারণের কারণে সিলেট শহর ক্রমেই ‘হিট আইল্যান্ডে’ পরিণত হচ্ছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, একসময় জলাভূমি ও গাছপালা তাপ শোষণ করত। কিন্তু এসব ধ্বংস হওয়ায় স্থানীয় জলবায়ুতে পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর পৃষ্ঠে পড়া সূর্যের আলো জলাভূমি ও উদ্ভিদ শোষণ করে নেয়। কিন্তু জলাভূমি ধ্বংস ও গাছ কাটার কারণে সেই তাপ সরাসরি প্রতিফলিত হয়ে বাতাসকে উত্তপ্ত করছে।’
আঞ্চলিক জলবায়ু ব্যবস্থা, জলবায়ু ঝুঁকি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে কাজ করা আনোয়ারুল বলেন, সিলেটসহ আমাদের শহরগুলোতে এখন তাপ শোষণ করার মতো প্রাকৃতিক স্থান কমে গেছে।
তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘শহরাঞ্চলের উঁচু ভবন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) বহির্গমন ব্যবস্থা তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলছে।’ অপরিকল্পিত উন্নয়ন পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আনোয়ারুল বলেন, গত ৩০ বছরে হাওর এলাকায় ভূমি ব্যবহারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। হাওর রক্ষার নামে বাঁধ নির্মাণ করে জলাভূমিকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত সেতু, সড়ক ও সুরক্ষা প্রকল্পও ভূমি ব্যবহারের ধরন বদলে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নির্বিচারে গাছ কাটা এবং হাউসবোটের ব্যবহার বৃদ্ধি হাওরের প্রতিবেশব্যবস্থার ক্ষতি করছে।
বদলে যাচ্ছে বৃষ্টিপাতের ধরন
গত দুই দশকে সিলেটে বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০১ সালে যেখানে অঞ্চলে ৩ হাজার ৪৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ২০৯ মিলিমিটারে।
বৃষ্টিপাতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু বর্ষাকালেই নয়, প্রাক-বর্ষা মৌসুমেও বৃষ্টিপাত বেড়েছে।
২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মার্চ থেকে মে—এই প্রাক-বর্ষা সময়ে গড় বৃষ্টিপাত ছিল ১ হাজার ৭২০ মিলিমিটার। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৫৭ মিলিমিটারে।
শাবিপ্রবির সহযোগী অধ্যাপক আনোয়ারুল বলেন, বঙ্গোপসাগর থেকে আর্দ্রতা বহনকারী উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু সিলেটের বৃষ্টিপাতকে প্রভাবিত করে।
তিনি বলেন, ‘মার্চ ও এপ্রিল মাসে সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রচুর সূর্যালোক শোষণ করে এবং জলীয়বাষ্প ছেড়ে দেয়। এই জলীয়বাষ্প বাতাসের মাধ্যমে এখানে এসে বৃষ্টিপাত ঘটায়। বর্ষা আগে শুরু হওয়ায় সিলেটেও আগাম বৃষ্টিপাত হচ্ছে।’
অতিরিক্ত বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাটি
বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি ও বারবার বন্যার কারণে সিলেটের মাটির গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে মাটির অম্লতা বাড়ছে এবং পুষ্টি উপাদান কমে যাচ্ছে।
গবেষকদের মতে, সিলেটের ৯২ শতাংশ মাটি অম্লীয়। এর মধ্যে ২৬ শতাংশ মাটি অত্যন্ত অম্লীয়। প্রায় ৬৬ শতাংশ মাটির পিএইচ (pH) মাত্রা ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ দশমিক ৫-এর মধ্যে। মাত্র ৮ শতাংশ মাটির পিএইচ ৫ দশমিক ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫-এর মধ্যে।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ২০০৫ ও ২০২৬ সালের গবেষণার তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সিলেটের বেশ কয়েকটি এলাকায় মাটির অম্লতা বেড়েছে।
একই সময়ে জৈব পদার্থ, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও সালফারসহ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।
সিলেটে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহ মাটির ক্ষয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামসহ বিভিন্ন উপাদান দ্রুত কমে যাচ্ছে। মাটির গুণগত মান নষ্ট হওয়ায় চাষাবাদের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে।’
অতিরিক্ত ইউরিয়া সার ব্যবহারের কারণেও মাটির অম্লতা বাড়ছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘সিলেটের প্রায় ৮০ শতাংশ মাটির পিএইচ ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ দশমিক ৫-এর মধ্যে। কম পিএইচযুক্ত মাটি লেবুজাতীয় ফল চাষের জন্য উপযোগী।’
সিলেটের প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকা হাওরাঞ্চল, যা বছরের বড় একটি সময় পানির নিচে থাকে। অম্লীয় মাটি ধান চাষে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি না করলেও ফল ও সবজি উৎপাদনে এটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে কৃষি
ঐতিহ্যগতভাবে সিলেটের অম্লীয় মাটি লেবুজাতীয় ফল চাষের জন্য উপযোগী হিসেবে বিবেচিত। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নত প্রযুক্তি ও বাগান সম্প্রসারণের কারণে কৃষির ধরনও বদলে যাচ্ছে।
সিলেট বিভাগে এখন কমলা ও লেবুর মতো লেবুজাতীয় ফলের তুলনায় আম ও কাঁঠালের উৎপাদন বেড়েছে।
উৎপাদন বাড়লেও আম ও কাঁঠাল এখনো অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারেনি। কারণ, সিলেট এখনো রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও টাঙ্গাইল থেকে এসব ফলের সরবরাহের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলেটের মাটি প্রাকৃতিকভাবেই লেবুজাতীয় ফলের জন্য উপযোগী। অন্যদিকে পাহাড়ি ভূমি কাঁঠাল চাষের জন্য অনুকূল।
খাদিমনগরের হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. রাকিবুল ইসলাম রুমান বলেন, অম্লীয় মাটির কারণে সিলেট লেবু, কমলা ও মাল্টা চাষের জন্য উপযোগী।
তিনি বলেন, ‘গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জে আনারস চাষও বাড়ছে। আম, কাঁঠাল ও তরমুজ চাষ করা যায়। তবে মাটির অম্লতা কমাতে প্রথমে চুন প্রয়োগ করতে হবে।’
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, মাটির পিএইচ কম হলেও অন্যান্য ফল চাষে তা বাধা সৃষ্টি করে না।
তিনি বলেন, ‘তবে জলবায়ু পরিবর্তন ফল উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও কুয়াশার কারণে রোগ ও পোকার আক্রমণ বাড়ছে, এতে আমসহ অন্যান্য ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় মাটির বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। সঠিকভাবে মাটি ব্যবস্থাপনা করতে পারলে সব ধরনের ফল উৎপাদন করা সম্ভব। তবে মাল্টা, পেয়ারা ও লেবুজাতীয় ফল এই মাটির জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি উপযোগী।


