জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি দলটি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণায় পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টের এক সংবাদ প্রকাশের পর রাজনীতি বা নির্বাচনী মাঠে নানা মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জামায়াতের ‘গোপন আঁতাতে’র অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষকরা এমন মতামত দিচ্ছেন।
তাদের মতে, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক বিষয়। দলটি এখন অনেকটাই পশ্চিমা দেশটির আস্থায় রয়েছে। যার নেপথ্যে রয়েছে, দেশটির নিজস্ব স্বার্থ এবং দক্ষিণ এশীয় নীতি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আগে থেকেই জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার যোগযোগ ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মাঠে এখন আছেই বিএনপি ও জামায়াত। তাই এসব দেশের কাছে জামায়াতের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জামায়াতও প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে তারা কোনো জঙ্গী সংগঠন নয়। তারা একটি আধুনিক ইসলামী রাজনৈতিক দল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতকে নিয়ে আগের ধারণা বদলেছে। দলটি সম্পর্কে তারা এখন ইতিবাচক। অবশ্য এখানে যুক্তরাষ্ট্রেরও নিজস্ব নানা স্বার্থ কাজ করছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরভিত্তিক ‘ব্লু ইকোনমি’, আন্তর্জাতিক শিপিং রুট, তেল-গ্যাস সম্পদ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা এ অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
পাশাপাশি আরাকান ও মিয়ানমার সংকটের ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক নজরদারিতে রয়েছে। এ ছাড়া, জ্বালানি নিরাপত্তা ও তেল-গ্যাস খাতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার উদ্যোগও আলোচনায় আছে। এসব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ স্বাভাবিক ও কৌশলগত বিষয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী টাইমসকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এখানে নির্বাচন প্রভাবিত করবে বা কারও সঙ্গে গোপন আঁতাত করবে, এটা রাজনৈতিক বক্তব্য। এর কোনো সত্যতা নেই। আগে দেশটি ইসলামের নাম শুনলে লাফ দিত, এখন সেটি নেই। জামায়াত যেহেতু এখন দেশের সাংবিধানিক এবং প্রচলিত আইন মেনে কাজ করছে সুতরাং দলটি সম্পর্কে এখন তাদের কোন সন্দেহ নেই। এখানে এখন বিএনপি বা জামায়াত যেই ক্ষমতায় আসুক তাদের সমস্যা নেই। আগে ভারতের কথামতো যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতকে দেখতে পারত না। এখন তারা বাংলাদেশকে ভারতের চোখে দেখছে না।’
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের টাইমসকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন আঁতাতের কোনো বিষয় নেই। যারা গোপন আঁতাতের অভিযোগ করছেন তারা বলতে পারবেন, আমরা কী আঁতাত করেছি? জামায়াতের নীতি হচ্ছে, গণতন্ত্রকামী সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। আমাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। আগামীতেও আমরা উভয় দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করব এটাই স্বাভাবিক।’
গত ২২ জানুয়ারি ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১ ডিসেম্বর ঢাকায় নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এক মার্কিন কূটনীতিকের অডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী, বাংলাদেশ আরো বেশি ইসলামমুখী হয়ে উঠেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো ফল করবে। ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা চাই তারা (জামায়াত) আমাদের বন্ধু হোক।’
ওয়াশিংটন পোস্টের সংবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে গত ২৪ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে গণসংযোগকালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে আমেরিকার আঁতাত দেশের জন্য ভালো নয়। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখাও প্রয়োজন।’
এরপর থেকে বিষয়টি সামনে এসেছে, যা এখন রাজনীতির মাঠে নিয়মিত আলোচনার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মঙ্গলবার এক নির্বাচনী জনসভায় বরগুনা-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য প্রার্থী সুলতান আহমেদ নির্বাচনী সভায় বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র চায় না পৃথিবীর কোথাও ইসলামী দল ক্ষমতায় আসুক। তারাও এবার চাইছে বাংলাদেশে ক্ষমতায় বদল আসুক।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সাব্বির আহমদ মনে করছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র দেখছে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দলটি আমেরিকার ইন্টারেস্ট বাদ দিয়ে শুধু ভারতের ইন্টারেস্ট দেখবে কি না। ‘
সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিবের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের মন্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে হয়তো ভারতকে খুশি করার একটা চেষ্টা থাকতে পারে। এক্ষত্রে বিএনপির টার্নটা ভালো কিন্তু বেশি টার্ন ফোকাসিং হলে অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়ে থাকে।
কয়েকদিন আগে ফেনী-২ আসনে জামায়াত জোট মনোনীত প্রার্থী এবি পার্টি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জুর নির্বাচনী বৈঠকে জামায়াত নেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘আমরা যদি শুধু ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে এগোতাম তাহলে এটি মৌলবাদ ও জঙ্গী হিসেবে চিহ্নিত হতো। নির্বাচনী জোটে অন্যদেরকে নেওয়ায় তা জাতীয় জোটে রূপান্তরিত হয়েছে। আমরা যখন প্রথমে চরমোনাইয়ের সঙ্গে (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) জোট করলাম তখন আমেরিকান অ্যাম্বাসিতে গেলে আমাকে তাদের একজন বলছেন, তোমরা তো মৌলবাদীদের সঙ্গে আছো। তখন আমি বললাম, তাদের মধ্যে যে কিছু এক্সট্রিমিজম আছে সেখান থেকে তাদেরকে দূরে আনতেছি। তখন তিনি বললেন, তাহলে ঠিক আছে।’
তাহেরের এ বক্তব্যের ব্যাপক সমালোচনা করেছেন ইসলামী আন্দোলনের নেতারা। দলটি এ বক্তব্যের অফিসিয়ালি প্রতিবাদও জানিয়েছে। দলটির অনেক নেতা জনসমক্ষে প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে বিশেষ কোনো দেশকে সন্তুষ্ট করতে ইসলামী আন্দোলনকে জোট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে কি না?
বেশিরভাগ বিশ্লেষক মনে করছেন, জামায়াতকে পশ্চিমারা আগের মতো আর মৌলবাদী দল মনে করছে না। আর জামায়াতও এ কারণে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কট্টর অবস্থান থেকে সরে এসেছে।
দলটি দেশের প্রচলিত আইনে সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি সামনে এনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে চমক আনতে চাইছে। গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতনের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাময়িক নিষিদ্ধ হওয়ায় দলটি নির্বাচনের বাইরে। তাই এবারের নির্বাচনে মূলত বিএনপি জোটের সঙ্গে জামায়াতের জোটের ভোটযুদ্ধ হচ্ছে।


