বুয়েনস এইরেসের বারগুলোতে ভিড় করা আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীরা এক অনন্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলেন। সোমবার ফুটবল ইতিহাসের সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই চরিত্রের দুই মহানায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসির দুটি স্মরণীয় বিশ্বকাপ মুহূর্ত একই দিনে উদযাপনের জোয়ারে ভেসেছে পুরো দেশ।
প্রয়াত ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনার জন্য দিনটি ছিল আবেগঘন। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের আজ ৪০ বছর পূর্ণ হলো, যে টুর্নামেন্টে প্রায় একাই আর্জেন্টিনাকে সোনালি ট্রফি এনে দিয়েছিলেন এই যন্ত্রণাকাতর প্রতিভা।
অন্যদিকে মাঠ ও মাঠের বাইরে সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির লিওনেল মেসি সোমবার রাতে তৈরি করলেন নতুন ইতিহাস। ২০২৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বমঞ্চে নিজের গোল সংখ্যাকে ১৮ তে নিয়ে গেছেন আলবিসেলেস্তে অধিনায়ক, যা তাকে বিশ্বকাপের সর্বকালীন একক সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে বসিয়েছে।
মাঠের বাইরের নানা বিতর্ক এবং ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ডোপিং পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও ম্যারাডোনা এখনো আর্জেন্টাইনদের কাছে এক আবেগের নাম। অন্যদিকে বিতর্ক ও মেসির নাম একই বাক্যে খুব কমই উচ্চারিত হয়, মেসির প্রতি ভক্তদের শ্রদ্ধা কেবলই মাঠে তার ফুটবলীয় জাদুর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
বুয়েনস এইরেসের ফ্যান জোনে খেলা দেখতে আসা ৩৮ বছর বয়সী ফার্নান্দো রোলান বলেন, ‘ম্যারাডোনা শ্রমজীবী শ্রেণি থেকে এসেছিলেন এবং তিনি সেই সাধারণ মানুষদের জন্য এমন সব সুখ নিয়ে এসেছিলেন, যা অন্যরা কেবল স্বপ্নে দেখতে পারে। অন্যদিকে মেসি অন্য একটি প্রজন্মের ফুটবলার, তবে আমি তাকেও পাগলের মতো ভালোবাসি।’
বুয়েনস এইরেসে মেসির ছবি বা প্রভাব এড়ানো অসম্ভব। শহরের আইকনিক ওবেলিস্কোকে যেমন তার ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছে, তেমনি পাতাগোনিয়া প্রদেশের নেউকেন শহরে রয়েছে তার ২৬ মিটার উঁচু এক বিশাল মূর্তি।
আর্জেন্টাইন ভক্তরা কাঁধে জাতীয় পতাকা জড়িয়ে এবং মুখে রং মেখে বার ও ফ্যান জোনগুলোতে উৎসব করছিলেন। ম্যারাডোনার স্বর্ণযুগের মতোই তারা তাদের বর্তমান নায়কের মনোযোগ নষ্ট করতে পারে এমন যেকোনো গুজবে তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। গত শুক্রবার যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ভুয়া খবর’ ছড়িয়ে পড়ে যে মেসির বাবা হোর্হে মারা গেছেন, তখন ভক্তদের মাঝে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে মেসি পরিবার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তার বাবা আসলে অসুস্থ এবং চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হোর্হের অসুস্থতার কথা ক্রীড়া সাংবাদিক ও ফুটবল অঙ্গনে আগে থেকে জানা থাকলেও মূলধারার গণমাধ্যম মেসির সুরক্ষায় বিষয়টি আড়ালে রেখেছিল।
এই খবরটি সামনে আসার পর আর্জেন্টিনার বিখ্যাত মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ইয়ানিনা লাতোরে বলেন, ‘সবাই জানত কিন্তু কেউ এই স্পর্শকাতর সময়ে মুখ খোলেনি। কারণ এই ধরণের ভুয়া খবর ছেলেটাকে মাঠের বাইরে অস্থির করে তোলে, যা দলের কোনো উপকারে আসে না।’
ভক্তদের চাওয়া একটাই, আর্জেন্টিনা যেন পরপর দুটি বিশ্বকাপ জেতার ইতিহাস গড়তে পারে এবং এই মিশন চলাকালীন মেসির মনোযোগে যেন কোনো কিছুর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। অস্ট্রিয়া ম্যাচের পর বাড়ি ফেরার পথে ৫৯ বছর বয়সী অস্কার আগুইলেরা বলেন, ‘আমরা বিশ্বকাপের মাঝামাঝি সময়ে আছি এবং দেশের মানুষ মেসির কোনো ক্ষতি হতে দেবে না। সবাই খুব বিচক্ষণতার সাথে কাজ করছে এবং এই মুহূর্তে মেসিকে সব ধরণের চাপ থেকে রক্ষা করা আমাদের প্রধান দায়িত্ব।’
আগামী বুধবার মেসির ৩৯তম জন্মদিন। এক সময় ফুটবল পাড়ায় জোর আলোচনা ছিল তিনি আদৌ ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলবেন কি না। ফ্যান জোনের বিশাল পর্দায় মেসির জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখে চোখ জুড়ানো হুয়ান বেভা নামের এক ভক্ত প্রতিপক্ষদের খোঁচা দিয়ে বলেন, ‘মেসি সত্যি তুলনাহীন। যে বুড়ো লোকটা অবসরের দ্বারপ্রান্তে ছিল বলে সমালোচনা করা হচ্ছিল? এই নাও, মেসি নিজের পায়ে মাঠেই তোমাদের সবার উপযুক্ত উত্তর দিয়ে দিয়েছে।’


