‘মেসির মতো ফুটবলার আর কখনো আসবে না’

‘মেসির মতো ফুটবলার আর কখনো আসবে না’
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গোল করার পর লিয়ান্দ্রো পারেদেসের সঙ্গে লিওনেল মেসির উল্লাস। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

বার্সেলোনার বিখ্যাত ‘লা মাসিয়া’ একাডেমি থেকে তখন নিয়মিত ঝাঁকে ঝাঁকে প্রতিভাবান তরুণ বের হচ্ছে, আবার একটু পরে হারিয়ে যাচ্ছে। ২০ বছর বয়সী জাভি হার্নান্দেজ তাই যখন প্রথম লিওনেল মেসির নাম শুনলেন, মনে কিছুটা সংশয় থাকাটা ছিল স্বাভাবিক। যেকোনো ‘হাইপ’ বা বাড়তি আলোচনায় গা না ভাসানো ছিল তার স্বভাব। কিন্তু একাডেমির এক যুব কোচ, যার ফুটবল জ্ঞানকে জাভি ভীষণ ভরসা করতেন, তিনি একদিন জাভিকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘জাভি, এই ছেলেটি কিন্তু বাকিদের চেয়ে আলাদা।’

সেই কোচ যে কতটা খাঁটি হিরে চিনেছিলেন, তা তখন জাভির ধারণারও বাইরে ছিল।

স্পেন ও বার্সেলোনার সাবেক এই অধিনায়ক সম্প্রতি দ্য অ্যাথলেটিকে তার দীর্ঘদিনের সতীর্থকে নিয়ে এক গভীর ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাঞ্জলি লিখেছেন, যা কোনো ফুটবল কলামের চেয়ে ফুটবল খেলাটার প্রতি এক পরম ভালোবাসার চিঠির মতোই বেশি মনে হয়।

২০০৪ সালে মেসি যখন অবশেষে বার্সেলোনার মূল দলের সঙ্গে অনুশীলনের জন্য মাঠে নামলেন, জাভি জানান যে জ্যেষ্ঠ খেলোয়াড়দের প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক এবং অভিন্ন। কার্লেস পুয়োল, ভিক্টর ভালদেস, ডেকো, রোনালদিনহো, ফুটবল বিশ্বের সবটুকু দেখে ফেলা এই মানুষগুলো তখন কেবল একে অপরের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়েছিলেন।

জাভি লিখেছেন, ‘আমরা কেবল একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিলাম, যেন আমাদের চোখ বলছিল “এটি কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়।” লিওর বয়স তখন মাত্র ১৬ এবং ও মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ক্লাবের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠেছিল।’

সবচেয়ে বেশি যা জাভিকে মুগ্ধ করেছিল, তা কোনো ড্রিবলিংয়ের মারপ্যাঁচ বা গোল ছিল না, বরং তা ছিল মেসির খেলার সরাসরি আক্রমণাত্মক রূপ। কোনো অযথা কারুকার্য বা বাড়তি প্রদর্শনী ছাড়াই, তার পুরো মনোযোগ থাকত সরাসরি প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে হানা দেওয়া। অথচ মাঠের বাইরে মেসি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সত্তা, ভীষণ লাজুক ও অন্তর্মুখী। এশিয়ায় প্রাক-মৌসুম সফরের সময় জাভির সঙ্গে একই রুমে থাকার সময় কেবল টেলিভিশনটি চালু করার জন্যও জাভির কাছ থেকে অনুমতি চাইতেন তিনি।

মেসির সঙ্গে মাঠ ভাগাভাগি করার অভিজ্ঞতা নিয়ে জাভি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, ‘আপনি যদি মেসির সঙ্গে মাঠে রসায়ন জমিয়ে তুলতে না পারেন, তবে ফুটবল খেলাটাই আপনার জন্য নয়, বিষয়টা এতটাই সহজ।’ মেসির দেওয়া প্রতিটি পাস সতীর্থের সুবিধাজনক পায়েই আসত। প্রতিটি মুভমেন্ট তিনি আগে থেকেই অনুমান করতে পারতেন এবং তার প্রতিটি স্পর্শ ছিল সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত।

আরও পড়ুন

জন্মগত প্রতিভার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মেসি মাঠে সতীর্থদের সঙ্গে অনবরত যোগাযোগ বজায় রাখতেন। কোনো ডিফেন্ডার তাকে খুব কড়া পাহারায় রাখলে তিনি জাভিকে তা জানাতেন, বলের খোঁজে মিডফিল্ডের নিচে নেমে আসতেন এবং এক অদ্ভুত সতর্কতায় পুরো মাঠ পর্যবেক্ষণ করতেন, সব সময় কেবল ফাঁকা জায়গা খুঁজতেন।

জাভি লিখেছেন, ‘ও অনবরত ওর চারপাশে কী ঘটছে তা মূল্যায়ন করে। প্রায়শই ওকে মাঠে স্রেফ হাঁটতে দেখা যায়, কিন্তু আসলে ও মনে মনে হিসাব কষতে থাকে যে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার কী করছে, সেন্টার-ব্যাক কী করছে এবং মাঠের কোথায় ফাঁকা জায়গা রয়েছে।’

মেসির অসংখ্য জাদুকরী মুহূর্তের মধ্যে জাভির চোখে যেটি সবার ওপরে স্থান পেয়েছে, তা হলো ২০১১ সালের বার্নাব্যুতে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালের প্রথম লেগের ম্যাচটি। হোসে মরিনহো সেবার মাঠের ঘাস বড় রেখেছিলেন যাতে ট্যাকটিক্যাল অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। আর ঠিক তখনই মেসি একক নৈপুণ্যে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন, একে একে লাসানা দিয়ারা, জাবি আলোনসো, রাউল আলবিওল এবং সার্জিও রামোসকে কাটিয়ে অবিশ্বাস্য এক গোল করেন, যেন ম্যাচের পরিস্থিতি ঠিক এমন কিছুই দাবি করছিল।

‘সেদিন মাঠে স্বাভাবিক কোনো ফুটবলই হচ্ছিল না’, অকপটে স্বীকার করেন জাভি। ‘আর ঠিক তখনই মেসি নিজের আসল রূপ দেখালেন। চরম সেই অচলাবস্থার মাঝেও ও যে একা হাতে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারত, সেটাই প্রমাণ করল।’

জাভির এই লেখার আবেগঘন দিকটি হলো, মেসির প্রতি তার মনের সেই বিস্ময় এখনো আগের মতো অমলিন রয়েছে। জাভি নিজে ৩৯ বছর বয়স পর্যন্ত ফুটবল খেললেও স্বীকার করেছেন, সেই বয়সের অনেক আগেই তিনি ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চ ছেড়ে দিয়েছিলেন। অথচ ঠিক একই বয়সে এসেও মেসি যেন সময়কে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন, হ্যাটট্রিক করছেন, আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছেন।

জাভি লিখেছেন, ‘২০২২ সালে বিশ্বকাপ জেতার পর অন্য যেকোনো খেলোয়াড় হলে ফুটবল থেকে অবসর নিয়ে নিত। কিন্তু ও জয়ের জন্য ক্ষুধার্ত এক অবিশ্বাস্য প্রতিযোগী।’

মেসিকে বোঝাতে গিয়ে জাভি বাস্কেটবল কিংবেন্দন্তি মাইকেল জর্ডানের উদাহরণ টেনেছেন। তার মতে, মেসি কেবল তাঁর প্রজন্মের সেরা নন, বরং ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, যার এই আধিপত্যের দীর্ঘস্থায়িত্ব একে আরও অবিশ্বাস্য করে তুলেছে।

‘ওর মানসিকতা অসাধারণ। আমার মতে, এই জিনিসটিই ওকে বাকিদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।’

মেসির এই ট্রফি বা পরিসংখ্যানের কোনো চেনা সমীকরণে জাভি তাঁর লেখার ইতি টানেননি। বরং একজন ফুটবল জিনিয়াস নিজে দাঁড়িয়ে আরেকজন অনন্য মহাজাগতিক জিনিয়াসের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিয়ে স্রেফ বলেছেন যে তাঁর বিশ্বাস, মেসির মতো ফুটবলার আমরা আর কখনো দেখতে পাব না।

খোদ জাভি হার্নান্দেজের মুখ থেকে যখন এই কথাটি আসে, তখন তা কোনো অতিশয়োক্তি নয়। এটিই মূলত ফুটবলের পরম সত্য।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad