বাংলাদেশে দুর্ঘটনার তদন্তে প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কমিটিতে রাখার রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। তবে এই রেওয়াজ মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব কমিটি দুর্ঘটনার আসল কারণ খুঁজে বের করতে পারে না, দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে পারে না আবার কোনো ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ারও অভিযোগ আছে।
রোববার ফার্মগেটে মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড পড়ে এক ব্যক্তি নিহতের ঘটনা নতুন করে প্রতিষ্ঠান নির্ভর বা আমলা-নির্ভর তদন্ত কমিটির গঠন নিয়ে প্রশ্ন সামনে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমলা-নির্ভর তদন্ত কমিটি বন্ধ করতে হবে, নইলে মেট্রোরেলসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে না।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ফার্মগেটে মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাডে খুলে পড়ার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তদন্তে কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটে এবং কারা দায়ী তা জানা যায়নি। বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।
সে সময় ১০ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। কমিটিতে ছিলেন মেট্রোরেল-৬ এর কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠান এনকেডিএম অ্যাসোসিয়েশন ৪ জন, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ৪ জন। পাশাপাশি মেট্রোরেলে প্রজেক্ট-১ ও প্রজেক্ট-৬ এর একজন করে প্রতিনিধি। অর্থাৎ তারা সবাই মেট্রোরেলের নির্মাণের সঙ্গে বা কোনো না কোনোভাবে এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
তদন্তে কী উঠে এসেছিল তা জানতে চাইলে, ওই কমিটির প্রধান ডিএমটিসিএল পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আব্দুল বাকী মিয়া তার এমডি ফারুক আহমেদের অনুমতি ছাড়া কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রোববার দুর্ঘটনার পর প্রায় চার ঘণ্টা মেট্রো চলাচল বন্ধ ছিল। পরে বেলা ৩টায় উত্তরা উত্তর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হয়। এরপর মতিঝিল থেকে শাহবাগ মেট্রোরেল চালু হয় সন্ধা ৭টার পর। সোমবার বেলা ১১টা থেকে উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রো রেল চালু হয়। তবে, বিজয় সরণি থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত মেট্রোরেল চলছে ধীর গতিতে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেট্রোরেল খুবই প্রযুক্তিনির্ভর গণপরিবহন। এটার কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই টেকনিক্যাল জ্ঞানসম্পন্ন লোককে দিয়ে তদন্ত করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, ‘আমি মনে করি এই কমিটিতে মেট্রোরেল এবং সড়ক মন্ত্রণালয়ের কোনো ব্যক্তির থাকা উচিত না। তদন্ত কমিটি হতে হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ।’
তিনি বলেন, ‘আমলা-নির্ভর মন্ত্রণালয়-নির্ভর তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে বড় অন্তরায়। কমিটির গঠন হওয়া উচিত ১০০ শতাংশ টেকনিক্যাল জ্ঞানসম্পন্ন লোক দিয়ে। লুকানোর চেষ্টা করলে রোগ তো ভালো হবেই না, বরং রোগের শাখা-প্রশাখা বাড়বে। এখন বিয়ারং প্যাড খুলে পড়েছে, একদিন ট্রেনের বগিও ভেঙে পড়তে পারে।’
রোববার ফার্মগেটের মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় যে তদন্ত পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে চারজনই মন্ত্রণালয় ও মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের।
রোববার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এখানে আরও আছেন মেট্রোরেলের লাইন-৫-এর প্রকল্প পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব। আবার একই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আসফিয়া সুলতানাকে কমিটির সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নতুন এই কমিটিতে কারিগরি ও প্রকৌশলগত পর্যালোচনার জন্য আছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এবিএম তৌফিক হাসান এবং সামরিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট (এমআইএসটি)-এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জাহিদুল ইসলাম। সোমবার তদন্ত কমিটিতে যোগ করা হয় প্রধান উপদেষ্টার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী শেখ মহিউদ্দিনকে। তবে, রোববারের দুর্ঘটনা মূলত পুরকৌশল জনিত হলেও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের কাউকে রাখা হয়নি বরং বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবিএম তৌফিক হাসানকে কমিটিতে রাখা হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ বিশেষ করে উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ-নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষার পরামর্শ দেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামসুল হক। তিনি বলেন, ‘প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে একটি স্বাধীন, দক্ষ ও প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম সংস্থার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি। এটি কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত হওয়া উচিত নয়।’
দেশের প্রথম মেট্রোরেল প্রকল্প উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার কয়েক ধাপে বাস্তবায়িত হয়। এটি দেশের ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্প, যার মোট ব্যয় ২২ হাজার কোটি টাকা। এই ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ অর্থায়ন করছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), অর্থাৎ প্রায় ১৬ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা, এবং বাকি ২৫ শতাংশ বহন করছে বাংলাদেশের সরকার, প্রায় ৫ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। সরকারের অংশটিতে ভূমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় কর ও অন্যান্য স্থানীয় ব্যয় অন্তর্ভুক্ত।
জাইকা ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ৭০ দশমিক ৬৯৩ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের ওডিএ ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং প্রকল্পের অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তার জন্য ২০২২ সালে পঞ্চম ধাপে ১৮ হাজার ২৮৫ মিলিয়ন ইয়েনের ঋণ অনুমোদন দেয়। ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর এবং পরিশোধ মেয়াদ ৪০ বছর নির্ধারিত; নির্মাণের জন্য সুদের হার শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ এবং পরামর্শ সেবার জন্য শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ।
প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্বাহী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল), যা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত। বর্তমানে এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেন ফারুক আহমেদ, প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আব্দুল ওয়াহাব, যিনি একজন প্রকৌশলী।
প্রকল্পের নকশা, তদারকি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছে জেনারেল কনসালট্যান্ট বা এনকেডিএম অ্যাসোসিয়েশন, যার নেতৃত্বে রয়েছে জাপানের নিপ্পন কোয়ে কো. লিমিটেড। এই কনসোর্টিয়ামে অংশ নিয়েছে ভারতের দিল্লি মেট্রোরেল করপোরেশন লিমিটেড (ডিএমআরসি), নিপ্পন কোয়ে ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড, বাংলাদেশের ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালট্যান্টস (ডিডিসি), যুক্তরাজ্যের মট ম্যাকডোনাল্ড লিমিটেড এবং জাপানের কাতাহিরা অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্টারন্যাশনাল।
এই কাজের জন্য ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর ৯২৮ কোটি টাকার চুক্তির আওতায় ডিজাইন, সুপারভিশন, প্রকিউরমেন্ট সাপোর্ট এবং প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টসহ ১০ বছরের সব ধরনের সেবা অন্তর্ভুক্ত। স্থানীয় নিয়ম মেনে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া টাকা প্রকল্পের মোট খরচের প্রায় ৪–৫ শতাংশ।


