ভারতের কয়লা খনিতে বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত ১৮ শ্রমিক নিহত ও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ে খনিটি অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় পুলিশের বরাতে বিবিসি জানায়, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টার দিকে রাজ্যের পূর্ব জয়ন্তিয়া হিল জেলায় এ ঘটনা ঘটে। খনিটি মেঘালয়ের রাজধানী শিলং থেকে প্রায় ৭২ কিলোমিটার দূরে একটি বনাঞ্চলের ভেতর অবস্থিত।
বিস্ফোরণের পর উদ্ধার অভিযান চলছে এবং এখনো অনেকে খনির ভেতরে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাজ্য পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট বিকাশ কুমার সাংবাদিকদের জানান, ‘র্যাট-হোল মাইনিং’-এর কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পদ্ধতি, যেখানে ডিনামাইট ব্যবহার করে সরু সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয় এবং শ্রমিকদের হাঁটু গেড়ে বসে বসে ওই সুড়ঙ্গ দিয়ে কয়লা তুলতে হয়।
অধিকারকর্মীরা জানান, রাজ্যে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অনেক খনিতেই ‘র্যাট-হোল মাইনিং’ চালু রয়েছে। পুলিশের ধারণা, খনির ভেতরে হওয়া এই বিস্ফোরণটি ডিনামাইটের কারণেই ঘটেছে।
বিকাশ কুমার বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১৮টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং গুরুতর দগ্ধ একজনকে শিলংয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে এখনও কতজন শ্রমিক ভূগর্ভে আটকে আছেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।’
এমনকি খনির মালিক বা পরিচালকদেরও এখনো শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। নিহতদের পরিচয়ও এখনো শনাক্ত করা যায়নি। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাজ্য পুলিশের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়েছে।
তবে কিছু স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সম্প্রতি বেশ কয়েকজন খনিশ্রমিক নিজেদের প্রতিবেশী আসাম রাজ্যের বাসিন্দা বলে পরিচয় দিয়েছিলেন।
এমন দাবির মুখে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, ‘যদি এটি প্রমাণিত হয়, তাহলে আমরা আসামের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সব ধরনের সহায়তা ও সমর্থন নিশ্চিত করব।’
মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তা দিতে দায়িত্ব নির্ধারণ করা হবে এবং যারা দোষী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিহতদের পরিবারকে দুই লাখ রুপি এবং আহত ব্যক্তিকে ৫০ হাজার রুপি আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন।
এই বিস্ফোরণটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে মেঘালয়ের অন্যতম প্রাণঘাতী খনি দুর্ঘটনা। এর আগে ২০১৮ সালে রাজ্যের একটি র্যাট-হোল খনিতে নদীর পানি ঢুকে পড়ায় অন্তত ১৫ জন শ্রমিক আটকা পড়েছিলেন। কয়েক মাসের উদ্ধার অভিযানে পাঁচজন শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হলেও দুজনের মরদেহ খুঁজে পায় পুলিশ। সেসময় আটকে পড়া বাকি শ্রমিকদের মৃত বলে ধরে নিয়ে উদ্ধার অভিযান সমাপ্তের ঘোষণা দেওয়া হয়।
মেঘালয়ভিত্তিক অবৈধ খনির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী অধিকারকর্মী অ্যাগনেস খারশিয়িং বলেন, ‘র্যাট-হোল মাইনিংয়ে চার থেকে পাঁচ ফুট উঁচু গর্ত খোঁড়া হয়, যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে কুঁকড়ে বসে কাজ করতে হয়। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।’
অধিকারকর্মীরা জানান, ২০১৪ সালে ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল র্যাট-হোল মাইনিং-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল এবং পরে সুপ্রিম কোর্টও তা বহাল রাখে। এরপরও মেঘালয়ের কিছু অংশে অবৈধ কয়লা খনন চলছেই। এর পেছনে হাইকোর্টের মনিটরিং কমিটিকে দায়ী করে বারবার আইন প্রয়োগে তাদের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করেন অধিকারকর্মীরা।
কেবল মেঘালয়ই নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুজরাট, ঝাড়খণ্ড, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধ কয়লা খনি গড়ে ওঠার খবর পাওয়া গেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, কয়লার উচ্চ চাহিদা, খনি এলাকায় দারিদ্র্য, দুর্গম অঞ্চলে দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং কথিত রাজনৈতিক মদতে অনিরাপদ ও নিয়ন্ত্রণহীন খনন কার্যক্রম চলতে থাকে। প্রায়ই কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও অভিজ্ঞতা ছাড়াই অবৈধ পদ্ধতিতে মাটি খনন করা হয়।


