জুলাইয়ে ৫ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন চবির হৃদয় চন্দ্র তরুয়া

জুলাইয়ে ৫ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন চবির হৃদয় চন্দ্র তরুয়া
হৃদয় চন্দ্র তরুয়া। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

বুকে গুলি লাগার পর ক্ষতস্থানে হাত চেপে ধরে বন্ধুদের সঙ্গে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। পথে বন্ধুদের বলেছিলেন, ‘বন্ধু, আমার হাত-পা অবশ হয়ে আসছে।’ তখন কেউ বুঝতে পারেননি, ওই গুলি শেষ পর্যন্ত কেড়ে নেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার জীবন।

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন ইতিহাস বিভাগের এই শিক্ষার্থী। এরপর পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৩ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

তরুয়ার মৃত্যুর দুই বছর পর তার সেই শেষ লড়াইয়ের স্মৃতি মনে রেখেছেন বন্ধু ও সহপাঠীরা। বহদ্দারহাটের সেই বিকাল থেকে শুরু করে হাসপাতালের বিছানায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনা এখনো তাদের মনে গেঁথে আছে।

১৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল বন্ধের ঘোষণা এলে অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ছেড়ে শহরে চলে যান। পরদিন দুপুরের পর বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন হৃদয়।

হৃদয় চন্দ্র তরুয়া। ছবি: সংগৃহীত

তার বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শামীম হোসাইন জানান, ১৮ তারিখ দুপুরের পর হৃদয় তাকে কল দিলে তারা আট থেকে নয়জন একসঙ্গে আন্দোলনে যান। সেখানে গিয়ে তরুয়া মুখে পেস্ট মেখে সামনের সারির দিকে চলে যান। অন্য বন্ধুরা মাঝামাঝি অবস্থানে ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর শওকত আর আমি দুই নম্বর গেটের দিকে চলে আসি। পরে তরুয়ার বিভাগের এক বন্ধু ফোন করে জানায়, ওর গুলি লেগেছে, হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।’

বুকে গুলি নিয়েই হাঁটার চেষ্টা

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও কিছুক্ষণ সচেতন ছিলেন তরুয়া। বুকের ক্ষতস্থান হাত দিয়ে চেপে ধরে নিজেই হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

আরও পড়ুন

শামীম হোসাইন বলেন, ‘রিকশা থেকে নামিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার সময় তরুয়া বলছিল, “বন্ধু, আমার হাত-পা অবশ হয়ে আসছে।” বুকের যেখানে গুলি লেগেছিল, ও সেখানে হাত দিয়ে চেপে ধরেছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তখনও বুঝতে পারিনি গুলিটা বুক বরাবর লেগেছে। ভেবেছিলাম, হয়তো রাবার বুলেট বা ছোট কোনো আঘাত।’

‘তাকে প্রথমে নগরের পার্কভিউ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার বক্ষব্যাধি হাসপাতাল হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।’

শামীম বলেন, ‘পার্কভিউ হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে চিকিৎসা শুরু করতে কিছুটা সময় চলে যায়। তখন বিভাগের একজন শিক্ষক এসে বলেন, সে আমার ছাত্র নয়, আমার সন্তান। আপনারা চিকিৎসা শুরু করেন, বাকিটা আমরা দেখব।’

তবে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। পাঁচ দিন পর, ২৩ জুলাই তিনি মারা যান।

যে স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল

পটুয়াখালীর চরপাড়া গ্রামের ছোট্ট একটি টিনের ঘরে বেড়ে উঠেছিলেন হৃদয় চন্দ্র তরুয়া। বাবা রতন তরুয়া কাঠমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালাতেন। অভাবের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া হৃদয়ের স্বপ্ন ছিল একটি ভালো চাকরি করা।

সেই স্বপ্ন শুধু নিজের জন্য ছিল না। বাবা-মায়ের জন্য একটি ভালো ঘর তৈরি করার ইচ্ছার কথাও প্রায়ই বন্ধুদের বলতেন তিনি।

তরুয়া বন্ধুদের কাছে প্রায়ই বলতেন, ‘আমাদের ছোট ঘরে সবাইকে নিয়ে বসার মতো জায়গা নেই। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পেলে বাবা-মায়ের জন্য একটি বড় ঘর বানাব।’

কিন্তু ২৩ জুলাই তরুয়ার মৃত্যুর সঙ্গে থেমে যায় সেই স্বপ্ন। যে ছেলে একদিন বাবা-মায়ের জন্য একটি বড় ঘর বানানোর কথা বলেছিলেন, তার সেই স্বপ্ন আজও পড়ে আছে পটুয়াখালীর চরপাড়ার ছোট্ট টিনের ঘরে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad