ঢাকা মহানগর (উত্তর) স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোসাব্বির হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ‘দিলীপ ওরফে বিনাশ দাদা’ নামে এক ব্যক্তির নাম এসেছে।
মোসাব্বির খুনের পর এই পরিচয়ে বুসন্ধরা শপিংমলের সামনে ফুটপাতের চারজন দোকানিকে একাধিক বিদেশি ফোন নম্বর থেকে কল করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে তিনজন তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করলেও পুলিশ তাদের আশ্বস্ত করতে পারেনি। ভয়ে তারা পরিবার নিয়ে ঢাকার বাইরে চলে গেছেন। একাধিক কল রেকর্ডে হুমকিদাতা নিজেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দাদা পরিচয় দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ক্যশৈনু মারমা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, হুমকির ঘটনায় করা জিডির তদন্ত হচ্ছে। দিলীপ নামটা আসল না ভুয়া, সেটা যাচাই করা হচ্ছে।
এদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে শনিবার সকালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ‘কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজি ও দখল বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বিদেশে অবস্থানরত আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী বিনাশ দাদা ওরফে দিলীপের নির্দেশে মুসাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম শুটার রহিমকে শুক্রবার সকালে নরসিংদী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও ১২ রাউন্ড গুলিও উদ্ধার করা হয়েছে। দ্বন্দ্ব থেকেই বিনাশের নির্দেশে শুটার রহিম এবং জিন্নাত কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেয়।’
ডিবি প্রধানের দাবি, ‘বিদেশে অবস্থানরত দিলীপ ওরফে বিনাশের নির্দেশেই এই হত্যাকাণ্ড। কারওয়ানবাজার কেন্দ্রীক ৮-৯টি চাঁদাবাজ গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।’
কে এই বিনাশ দাদা?
কারওয়ান বাজার ও বসুন্ধরা সিটির সামনের ফুটপাতের একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর ধরে তারা দিলীপ বা বিনাশ দাদা নাম শুনলেও কেউ তাকে দেখেননি। এই পরিচয়ে বিজিন্নজনের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে মোবাইল ফোনে কল আসে। চাঁদা দাাবি করে হুমকি দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বসুন্ধরার সামনে ফুটপাতের ৫০-৬০টি দোকানে দিলীপের লোকজন চাঁদা দাবি করে। চাঁদার টাকা না পেয়ে বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় এবং একাধিক দোকানে অগ্নিসংযোগ করে। এ ঘটনায় আমান নামে এক ব্যবসায়ী দিলীপের ঘনিষ্ট সুমনের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় মামলা করেন। পরে প্রাণনাশের হুমকি দিলে তিনি সেই মামলা প্রত্যাহার করে নেন।
অপরদিকে, গত ৭ ডিসেম্বর মোসাব্বির খুনের পর দিলীপ পরিচয়ে একাধিক বিদেশি নম্বর থেকে আখতার, রনি, মিলন ও সাগর নামে চার ব্যবসায়ীকে কল করে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে।
তাদের বলা হয়েছে ‘তোর ভাইরে খাইছি, তোরেও খামু, তরে ফাইলা দিমু।’ এ হুমকির পর তাদের তিনজনই জিডি করেছেন।
এর পর গত ১০ ডিসেম্বর ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ করতে একটি বিদেশি নম্বর দেওয়া হয়। হুমকির বিষয়টি তেজগাঁও থানার ওসিকে জানানো হয়। কিন্তু নিরাপত্তা দিতে পারবেন না জানিয়ে সবাইকে সাবধানে থাকতে পরামর্শ দেন তিনি। ডিবির এডিসি মুর্শেদও তাদের একজনকে একই পরামর্শ দিয়েছেন।
ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, দিলীপ আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন সন্ত্রাসী।
পুলিশের এক কর্মকর্তার কাছে থাকা তথ্যমতে, দিলীপের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায়। তিনি এক সময় ঢাকার কাঁঠালবাগান এলাকায় অপরাধ জগতে সক্রিয় ছিলেন।
চারজন গ্রেপ্তার
গত ৭ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে স্টার হোটেলের পেছনে মোসাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরদিন ৮ জানুয়ারি তেজগাঁও থানায় অজ্ঞাতনামা চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন নিহত মুসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম।
এ ঘটনায় এর আগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা হলেন, জিন্নাত (২৪), আব্দুল কাদির (২৮) ও মো. রিয়াজ (৩২)। আদালতের নির্দেশে তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়। তারা কারাগারে আছেন। সবশেষ শুক্রবার রহিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিন্নাত, কাদির ও রহিম আপন ভাই।


