মিয়ানমারের নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশ সীমান্তে সর্বোচ্চ সর্তক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি)।
সামরিক জান্তার অধীনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটিতে চরম ভয়, অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মিয়ানমার জুড়ে চলমান সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাতেও।
রাখাইন রাজ্যে গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলার বিকট শব্দে কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্তবর্তী জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের মানুষকে আশ্বস্ত করে বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
উখিয়া ব্যাটালিয়ন (৬৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জসীম উদ্দিন বলেন, ‘গতরাত ১০টা ৩৮ মিনিট থেকে ১০টা ৫৫ মিনিটের মধ্যে মিয়ানমারের ভেতরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সীমান্তে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।’
টেকনাফ ব্যাটালিয়ান (২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে চলমান সংঘাতের কারণে কিছু এলাকায় বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ শোনা গেলেও বাংলাদেশের ভূখণ্ডে কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সীমান্ত পরিস্থিতি বিজিবির সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রয়েছে। অনুপ্রবেশ বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
প্রায় পাঁচ বছর পর রোববার মিয়ানমারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত দেশটিতে এটিই প্রথম নির্বাচন। তবে সামরিক জান্তার তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই ভোটকে দেশটির সাধারণ মানুষ ‘প্রহসন’ ও ‘জালিয়াতিপূর্ণ’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, মান্দালয় শহরের আউংমেয়থাজান আসনে জান্তাপন্থী ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল তাইজা কিয়াওয়ের নির্বাচনী সমাবেশে উপস্থিত মানুষের মধ্যেও ভোটের কোনো উন্মাদনা ছিল না।
সমাবেশে সামরিক গোয়েন্দাদের নজরদারি এবং স্বৈরতান্ত্রিক পরিবেশে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন সাধারণ মানুষ। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত বহু পরিবার সহায়তার আশায় সেখানে এলেও, সমাবেশ শেষ হতেই দ্রুত সরে পড়ে।
দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) নিষিদ্ধ এবং দলনেত্রী অং সান সু চি কারাবন্দি থাকায় ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে।
গভীর রাতে সীমান্তে বিস্ফোরণের শব্দ
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের জেরে শনিবার রাতে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় একাধিকবার বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, শনিবার রাত ১০টা ৫০ মিনিট থেকে ১১টা ১০ মিনিটের মধ্যে টেকনাফের টেকনাফ পৌরসভা, নেটং পাড়া, শাহপরির দ্বীপ, হোয়াইক্যং, উলুবনিয়া, খারাংখালী, লম্বাবিল ও তেঁচ্ছি ব্রিজ এলাকায় বিকট শব্দ শোনা যায়।
একই সময়ে উখিয়ার পালংখালী আঞ্জুমানপাড়া, রহমতের বিল এবং নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্তেও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে।
উখিয়ার রহমতের বিল এলাকার বাসিন্দা বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘হঠাৎ বিকট শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। আতঙ্কে অনেকেই ঘর ছেড়ে বাইরে বের হয়ে যান।’
বিমান হামলার শব্দ বাংলাদেশেও
স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, মিয়ানমারের উত্তর মংডু এলাকায় বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে জান্তা সরকার বিমান হামলা চালাচ্ছে।
রাখাইনভিত্তিক কয়েকটি অনলাইন মাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, শনিবার রাতে উত্তর মংডুতে তিন দফা বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত অধিকারকর্মী সাহাত জিয়া হিরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, মিয়ানমারের বিমান হামলার শব্দ কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকেও শোনা গেছে।
এর আগে, চলতি মাসের ১৩ ও ১৭ ডিসেম্বরও সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল। এতে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

কারাবন্দি অং সান সু চি, বিতর্কিত নির্বাচন
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে গণতন্ত্রপন্থি নেতা অং সান সু চির অনুপস্থিতি মিয়ানমারের আসন্ন নির্বাচনের ওপর গভীর ছায়া ফেলেছে। সামরিক কাউন্সিল এই নির্বাচনকে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পথ হিসেবে প্রচার করলেও দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকদের মতে, সু চিকে বাদ দিয়ে আয়োজিত এই ভোট কোনোভাবেই অবাধ ও সুষ্ঠু হতে পারে না।
২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনে এনএলডি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেও সেনাবাহিনী ফলাফল বাতিল করে দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং অং সান সু চিকে কারাগারে পাঠায়। সু চির সমর্থকদের মতে, ব্যালট থেকে তার অনুপস্থিতিই প্রমাণ করে যে এই নির্বাচন জনগণের রায় অগ্রাহ্য করার কৌশল মাত্র।
১৯৪৫ সালের ১৯ জুন জন্ম নেওয়া নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চি, যিনি মিয়ানমারে ‘দ্য লেডি’ নামে পরিচিত, নির্বাচনকালীন সময়েও কারাবন্দি রয়েছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছেন। তবে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় তার সরকারের ভূমিকার কারণে আন্তর্জাতিক মহলে তার ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে সামরিক কাউন্সিল ঘোষণা দেয়, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে চার ধাপে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে দুই কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ পিদাউংসু হ্লুত্তাও গঠিত হবে। তবে ২০০৮ সালের সংবিধান অনুযায়ী সংসদের ২৫ শতাংশ আসন সরাসরি সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত থাকায় প্রকৃত ক্ষমতা তাদের হাতেই থেকে যাচ্ছে।
এদিকে, মিয়ানমারের চলমান জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশটিতে অব্যাহত সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ প্রত্যাবর্তন নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মধ্যে মিয়ানমারের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হলেও সেখানে গভীর আক্ষেপ রয়েছে। কারণ, তারা নিজ দেশের এই নির্বাচনে কোনোভাবেই অংশগ্রহণ করতে পারছে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা শুনেছি, নির্বাচন চলাকালীন সময়েও গত রাতে রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি না—সেটাই বড় প্রশ্ন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন যদি গ্রহণযোগ্য না হয় এবং সামরিক জান্তা আন্তর্জাতিকভাবে চাপে না পড়ে, তাহলে তারা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আগ্রহী নাও হতে পারে।’
‘তার মানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে যে শঙ্কা রয়েছে, তা থেকেই যাচ্ছে,’ যোগ করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নাগরিক অধিকার স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত না হলে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন কঠিন হবে।


