জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে প্রাণহানি ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা অসংখ্য মামলা আদালতে মুখ থুবড়ে পড়ছে। দুর্বল সাক্ষ্যপ্রমাণ ও মিথ্যা অভিযোগকে এর কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এধরণের মামলায় মোট ১৪ হাজার ১৩৭ জন আসামির মধ্যে ১০ হাজার ৯৮৭ জনকেই প্রমাণের অভাবে অভিযোগ থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত হয়েছেন মাত্র ৩ হাজার ১৫০ জন।
এই পরিসংখ্যান বলছে, অভিযুক্তদের মধ্যে প্রায় প্রতি পাঁচজনের চারজনই মামলা থেকে অব্যহতি পেয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, ভুল তথ্য ও মিথ্যা দাবির ওপর ভিত্তি করে মামলা করার প্রবণতাই এর মূল কারণ।
এমনই একটি মামলায় জহিরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের ১২৩ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করেন, জুলাই অভ্যুত্থানে তার ছেলে জিহাদ মারা গেছে। কিন্তু পুলিশি তদন্তে দেখা যায় জিহাদ আসলে জীবিত আছে।
তদন্তকারীরা জানান, কেরানীগঞ্জে অন্য কোনো কারণে পাওয়া একটি আঘাতকে এই মামলায় মিথ্যাভাবে হত্যাকাণ্ড হিসেবে সাজানো হয়েছিল। গত বছরের ৩০ অক্টোবর আদালত এই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতি দেয়।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার তদন্ত কর্মকর্তা বদিয়ার রহমান জানান, কিছু মানুষ জহিরুলকে এই মামলা করতে প্ররোচিত করেছিল। তিনি আরও জানান, জহিরুল প্রথমে আবাসন ও নগদ টাকার বিনিময়ে ছেলেকে শুধু আহত দাবি করে মামলা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে একটি চক্র তার অজান্তেই ছেলেটিকে মৃত হিসেবে প্রচার করে মামলাটি সাজায়।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলা করলে বাদীর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুবই কম।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জানান, হয়রানির উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা করলে শাস্তির বিধান আইনে স্পষ্ট আছে। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না।
সাজানো মামলার বিষয়ে একটি স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম। তার মতে, যারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে হয়রানি করেছে বা মামলা দিয়ে ফায়দা লুটেছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন। এটি একদিকে যেমন প্রকৃত ভুক্তভোগীদের বিচার নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে নির্দোষ মানুষকে হয়রানি থেকে রক্ষা করবে।
২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে। এতে নিহতদের মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছিল শিশু। এছাড়া আহত হয় বিপুল সংখ্যক মানুষ।
গণঅভ্যুত্থানের পর সারা দেশে হাজার হাজার মামলা হলেও শুরু থেকেই টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে মামলার অভিযোগ উঠতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে টাকা দিতে অস্বীকার করায় বা আর্থিক সমঝোতার চাপে ফেলতে অনেককে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পুলিশি তদন্তে একই ঘটনায় একাধিক খুনের মামলা এবং পুরোপুরি বানোয়াট কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে দায়ের করা মামলার প্রমাণও পাওয়া গেছে।
পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী আরও বলেন, অনেক মামলা ‘ভাসমান সাক্ষীদের’ ওপর নির্ভর করে করা হয়। পরে এসব সাক্ষীকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেক সময় বাদী ও বিবাদীরা আদালতের বাইরে আপস করে ফেলেন।
আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম অভিযোগ করেন, বিপুল সংখ্যক মানুষকে আসামি করে মামলা করা এখন একটি ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হয়েছে। অনেকে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য সাজানো ঘটনায় মামলা করেছেন।
তিনি তদন্তের দুর্বলতার দিকেও আঙুল তোলেন। তার মতে, পুলিশকে আরও সতর্ক ও কঠোরভাবে তদন্ত করতে হবে। এতে কোনো অপরাধী যেন আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে না যায় এবং কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হয়।
আদালতের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অভ্যুত্থান পরবর্তী পাঁচ মাসে আসামিদের প্রায় ৭৮ শতাংশ খালাস পেয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকার আদালতগুলো প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মামলা নিষ্পত্তি করেছে। এসব মামলায় ৩ হাজার ৫৭১ জন আসামির মধ্যে ২ হাজার ৮৯৪ জন অব্যহতি পান এবং অভিযুক্ত হন মাত্র ৬৭৭ জন। এই ধারা ২০২৫ সালেও বজায় ছিল। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ হাজার ৫২০ জন আসামির মধ্যে ৭ হাজার ৪০০ জন অব্যহতি পেয়েছেন।
কিছু ক্ষেত্রে তথাকথিত ভুক্তভোগীদের কোনো হদিসই পাওয়া যায়নি। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ধানমন্ডি থানায় ১০ জনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলাটির তদন্তভার পায় এবং চারজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক শাহজাহান ভূঁইয়া কথিত ভুক্তভোগীদের কাউকেই খুঁজে পাননি। ফলে ৫ নভেম্বর মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় এবং আসামিরা ছাড়া পান।
আবার এক এলাকার ঘটনা অন্য এলাকায় মামলা করার ঘটনাও ঘটেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রিয়াজ নামে এক ছাত্র মোহাম্মদপুরের বসিলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। কিন্তু একই ঘটনায় কেরানীগঞ্জে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদসহ ৩১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার উপ-পরিদর্শক মোঃ ইলিয়াস হোসেন তদন্তে দেখেন, ওই এলাকায় এই নামে কেউ মারা যাননি। আদালত পরে অভিযোগের কোনো ভিত্তি না থাকায় মামলাটি খারিজ করে দেয় এবং বন্দিদের মুক্তির নির্দেশ দেয়।
দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা বা ভিত্তিহীন মামলা করলে বাদীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। বড় কোনো অপরাধের মিথ্যা অভিযোগ করলে বাদীর সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দিতে পারেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া জানান, আইন থাকলেও এর প্রয়োগ বিরল। মিথ্যা মামলায় যারা মাসের পর মাস কারাগারে কাটান, তাদের ক্ষতিপূরণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই বলে জানান আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন।
তবে জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মিথ্যা মামলার বিষয়ে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না, সে বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।


