যদি মার্শাল ম্যাকলুহান আজকের ডিজিটাল যুগে বেঁচে থাকতেন, তিনি হয়তো নিজের সেই বিখ্যাত উক্তিটিকে একটু পাল্টে বলতেন, ’মিডিয়াই বার্তা নয়, এখন মিমই বার্তা।’ কারণ, মিম কেবল কোনো বার্তা বহন করে না, বরং সেটিই হয়ে ওঠে বার্তার রূপ, ভাব এবং অভিজ্ঞতা। মিম এমন এক হাইপার কমপ্রেসড কমিউনিকেশন ইউনিট, যেখানে তথ্য, আবেগ, ব্যঙ্গ ও রাজনীতি একসঙ্গে মিশে যায়।
ম্যাকলুহানের ভাষায়, ‘মিডিয়াই বার্তা’ মানে মাধ্যমই মানুষের উপলব্ধিকে গড়ে তোলে। আর আজ সেই ভূমিকা পালন করছে মিম, যেখানে একটি ছবি, ইমোজি বা এক লাইন টেক্সট হয়ে ওঠে সমগ্র প্রজন্মের আবেগের ভাষা। অর্থাৎ মিম শুধু ‘মেসেজের বাহক’ নয়, সেটি আজ ‘সংবাদ, মাধ্যম ও ভাষা’–সব একসঙ্গে।
বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবী আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে হাসিও এক ধরনের বার্তা, আর ব্যঙ্গও এক প্রকার প্রতিবাদ। আমরা এখন এক নেটওয়ার্কড সমাজে বাস করি, যেখানে মানুষ শুধু তথ্যের গ্রাহক নয়, তথ্যের স্রষ্টাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্ম নিয়েছে এক নতুন ভাষা, যা অনেক সময় শব্দ ছাড়াই কথা বলে। এই ভাষার নাম ‘মিম’।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের প্রায় ৯২ শতাংশ নিয়মিত মিম দেখে বা শেয়ার করে। তাদের মধ্যে অনেকেই জানে না যে, এই রসিকতা বা কৌতুক আসলে সামাজিক প্রতিক্রিয়ার এক রূপ। গবেষণায় বলা হয়েছে, মিম এখন এক ধরনের সামাজিক এক্সপ্রেশন, যা অনেক সময় কথায় বা লেখায় বলা সম্ভব হয় না।
মিমের ধারণাটি নতুন নয়। জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে দ্য সেল্ফিশ জিন বইয়ে বলেছিলেন, সমাজে কোনো আচরণ, রুচি বা চিন্তা যেমন একে অপরের মধ্যে ছড়ায়, সেটি এক ধরনের ‘সংস্কৃতিক জিন’, অর্থাৎ মিম। আজকের ইন্টারনেট যুগ সেই ধারণাকে দৃশ্যমান করেছে। একটি মিম তৈরি হয়, শেয়ার হয়, আবার অন্য কেউ সেটিকে নতুনভাবে বানায়–এই ধারাবাহিকতাই মিমের ডিজিটাল বংশানুক্রম।
বাংলাদেশে ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটক শুধু বিনোদনের প্ল্যাটফর্ম নয়–এগুলো এখন এক নতুন জনপরিসর, যেখানে হাস্যরসের মধ্য দিয়েও মানুষ কথা বলে, সমালোচনা করে, প্রতিবাদ জানায়। একসময় পত্রিকার ব্যঙ্গচিত্র বা রাজনৈতিক কার্টুন সমাজের অসংগতি তুলে ধরত, আজ মিম সেই ভূমিকায় হাজির। বিশেষ করে যখন গণমাধ্যমে সমালোচনার পরিসর সংকুচিত হয়, তখন মিম হয়ে ওঠে নাগরিকদের বিকল্প কণ্ঠস্বর।
কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে মানুষ যখন গৃহবন্দী, তখন এক ছোট্ট কুকুর–চিমস–বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের মুখে হাসি ফিরিয়েছিল। শিবা ইনু জাতের সেই কুকুরের নিষ্পাপ মুখ নিয়ে তৈরি মিমগুলো ছিল এক ধরনের ডিজিটাল থেরাপি। বলটজ নামের সেই প্রাণীটি মারা গেলে তার মালিক লিখেছিলেন, ‘দুঃখিত হবেন না, ভাবুন চিমস এই পৃথিবীকে হাসিয়েছে।’ ডিজিটাল যুগে রসিকতাও যে এখন আবেগের, এমনকি শোকের ভাষা হয়ে উঠেছে, সেটিই এর প্রমাণ।
তবে হাস্যরসের এই সংস্কৃতির কিছু অন্ধকার দিকও আছে। কখনো কখনো মিম ব্যক্তিগত আক্রমণের বা ট্রলের অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। গবেষক সারা মনামী হোসেন তার প্রবন্ধে সতর্ক করেছেন, ফেসবুকের ট্রল বা মিম অনেক সময় আত্মতৃপ্তি বা আঘাতের হাতিয়ার হয়ে যায়, যা মনস্তাত্ত্বিকভাবে সহিংস। ফলে মিমের ভাষা যেমন মুক্তির, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন হলে তা হয়ে উঠতে পারে নিপীড়নেরও।
বিশ্বজুড়ে মিম এখন সাংস্কৃতিক দলিল। হংকংয়ের 9GAG সংস্থা এমনকি ‘মিম মিউজিয়াম’ খুলেছে, যেখানে ভাইরাল মিমগুলো সংরক্ষিত। আমেরিকায় ‘Pepe the Frog’ একসময় মজা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ভারতে নির্বাচনী রাজনীতিতেও দেখা গেছে মিম ব্যবহৃত হচ্ছে ভোটারদের প্রভাবিত করতে। অর্থাৎ মিম এখন শুধু হাসির নয়, এটি রাজনৈতিক কৌশলও। এই বৈশ্বিক প্রবণতার মধ্যেই বাংলাদেশের মিম-সংস্কৃতি নিজের রূপ নিচ্ছে–যেখানে ব্যঙ্গ, প্রতিবাদ ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
নিউ মিডিয়ার গবেষক জে ডেভিড বোল্টার ও রিচার্ড গ্রুসিন তাদের ‘Remediation: Understanding New Media’ গ্রন্থে বলেছেন, নতুন মাধ্যম কখনো পুরোনো মাধ্যমকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করে না, বরং তার উপাদানগুলোকে নতুনভাবে রূপ দেয়। মিম সেই তত্ত্বের সবচেয়ে কার্যকর উদাহরণ। সংবাদপত্রে কার্টুন, টেলিভিশনে ব্যঙ্গ নাটক, রেডিওতে হাস্যরসাত্মক অনুষ্ঠান–সবকিছুর রূপান্তর ঘটেছে আজ মিমে। অতীতের ব্যঙ্গ এখন মোবাইল স্ক্রিনে এক মিনিটেই ভাইরাল হয়। পুরোনো মাধ্যমের রস ও তীক্ষ্ণতা হারিয়ে যায়নি, বরং ডিজিটাল ফরম্যাটে ফিরে এসেছে আরও দ্রুত, সংক্ষিপ্ত, নেটাগরিকদের নাগালে।
মিম আসলে মানুষের এক ধরনের আবেগের শর্টকাট। যে কথাটি বলতে গেলে লম্বা লেখা বা বক্তৃতা দরকার, সেটি একটি ছবিতে কয়েকটি শব্দে বলা হয়ে যায়। এই তীব্রতা ও গতি মিমকে করেছে আধুনিক যুগের কার্যকর যোগাযোগমাধ্যম। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কিংবা অনলাইন সেন্সরশিপের এই সময়ে মিম অনেক সময় হয়ে উঠছে নীরব প্রতিবাদের আশ্রয়। কারও কাছে এটি আত্মপ্রকাশের পথ, কারও কাছে অস্ত্র, আবার কারও কাছে বিনোদন। তবে এ কথা নিশ্চিত–মিম আজ আমাদের সময়ের সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশে মিম কালচার এখন এক প্রজন্মের ডিজিটাল পরিচয়ের অংশ। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা এক্স (টুইটার)–সব জায়গায়ই তরুণরা নিজেদের ভাবনা, হতাশা, রাজনৈতিক মত কিংবা সামাজিক ব্যঙ্গ প্রকাশ করছে মিমের ভাষায়। আগে যেখানে রাস্তায় পোস্টার লাগানো বা দেয়াল লিখন ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার, এখন তার জায়গা নিয়েছে স্ক্রিনে তৈরি হাসির ছবি। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মিমস,’ ‘ইঞ্জিনিয়ারিং মিমস,’ বা ‘বাংলাদেশি পাবলিক মিমস’–এসব পেজ শুধু মজার কনটেন্ট দেয় না, বরং সমাজের নিত্য বাস্তবতা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনকেও মজার ছলে তুলে ধরে। কখনো সরকারবিরোধী ক্ষোভ, কখনো সামাজিক বৈষম্যের ব্যঙ্গ–সবকিছুই মিমে রূপ পায়। এই সংস্কৃতি দেখাচ্ছে, তরুণ প্রজন্ম রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে উদাসীন নয়; তারা শুধু প্রকাশের ভঙ্গি বদলে ফেলেছে। হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে সচেতনতা, প্রতিবাদ এবং এক নতুন ধরনের নাগরিক অংশগ্রহণ।
মার্শাল ম্যাকলুহান বলেছিলেন, ‘মিডিয়াই বার্তা।’ যদি তিনি আজ বেঁচে থাকতেন, হয়তো বলতেন, ‘মিমই এখন বার্তা।’ কারণ মিমের ভেতরে আছে তথ্য, ব্যঙ্গ, শিল্প ও রাজনীতি–সবকিছুর মিশেল। একবিংশ শতাব্দীর দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজে মিম যেন এক নতুন গণভাষা, যেখানে নাগরিকেরা কিবোর্ডে নয়, ইমোজি ও ব্যঙ্গের রেখায় নিজেদের কথা বলে।
যে সমাজে হাসি সেন্সর করা যায় না, সেই সমাজে মিমই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ব্যঙ্গ। ডিজিটাল যুগে মিম কেবল রসিকতা নয়, এটি নতুন গণমাধ্যমের পুনর্জন্ম–যেখানে সংবাদ, ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদ মিশে এক অনন্য যোগাযোগের রূপ নিয়েছে। আর হয়তো ভবিষ্যতের ইতিহাস একদিন লিখবে–‘যেখানে মানুষ চুপ ছিল, সেখানে মিম কথা বলেছিল।’
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


