মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতির মুখে পড়ছে ইরানের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা। সেখানকার ঐতিহাসিক শহর ইশফাহানের গভর্নর দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলায় দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ‘একটি সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার’ শামিল।
গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত হামলায় সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তেহরানের ১৪শ শতকের গোলেস্তান প্রাসাদ এবং ইসফাহানের ১৭শ শতকের চেহেল সুতুন প্রাসাদ।
ভিডিও ফুটেজ ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কোনো ভবনেই সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেনি। বরং কাছাকাছি বিস্ফোরণের প্রচণ্ড ধাক্কা এবং সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষের আঘাতে এসব প্রাসাদের জানালা ভেঙে গেছে এবং টাইলস ও দেয়ালের অংশ খুলে পড়েছে।
বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, গোলেস্তান প্রাসাদের বিখ্যাত ‘হল অব মিররস’ ধ্বংস হয়ে গেছে।
এর সূক্ষ্ম কাজের আয়নার টুকরো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাসাদটি ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান। ২ মার্চে হওয়া ওই ক্ষয়ক্ষতির পর জাতিসংঘের এই সাংস্কৃতিক সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, যে তারা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে।
যদিও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেন, এক্ষেত্রে ইউনেস্কোর প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট শক্ত ছিল না। সামাজিক মাধ্যমে তিনি বলেন, সংস্থাটির নীরবতা ‘অগ্রহণযোগ্য’। এমন ধ্বংসযজ্ঞের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে বলেন, ১৪শ শতাব্দীর পুরোনো ইরানি ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা করছে তারা।
এক্স পোস্টে তিনি আরও লেখেন, ‘যাদের শাসনব্যবস্থা এক শতাব্দীও টিকে থাকার সম্ভাবনা নেই তারা যে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাসসমৃদ্ধ জাতিগুলোকে ঘৃণা করবে এটাই স্বাভাবিক।’
ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে লোরেস্তান প্রদেশের খোররামাবাদে অবস্থিত ফালাক-অল- আফলাক দুর্গ। প্রাদেশিক ঐতিহ্য বিভাগের প্রধান আতা হাসানপুর জানান, রবিবার দুর্গটির সীমানায় হামলা হয়, তাতে বিভাগের অফিস, পাশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক জাদুঘর ধ্বংস হয়ে যায় এবং পাঁচজন কর্মী আহত হন।
টেলিগ্রামে তিনি লিখেছেন, ‘সৌভাগ্যবশত ফালাক-অল-আফলাক দুর্গের মূল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।’

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর বলছে, হামলায় ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দিস্তান প্রদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সানান্দাজ শহরে কুর্দি জাদুঘর ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে ব্যবহৃত ১৯শ শতকের সালার সায়েদ ম্যানসন এবং আসিফ ভাজিরি ম্যানসনের এসবের দরজা ও সূক্ষ্ম রঙিন কাঁচের জানালাগুলোর ক্ষতি হয়েছে।
সম্প্রতি ইরানের কেন্দ্রীয় শহর ইসফাহানে বড় বড় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তিনটি ঐতিহাসিক যুগে এই শহর ছিল ইরানের রাজধানী। শহরটির বেশিরভাগ স্থাপত্য ১৬ থেকে ১৮শ শতকের সাফাভি ডাইনাস্টি যুগের।
ইসফাহানের গভর্নর মেহদি জামালিনেজাদ বলেন, যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে আগেই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর অবস্থান জানানো হয়েছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোর ছাদে ১৯৫৪ সালে করা সাংস্কৃতিক সম্পত্তি রক্ষার জন্য হেগ কনভেনশন সাংস্কৃতিক সম্পদ নির্দেশক ‘ব্লু শিল্ড’ চিহ্নও বসানো ছিল।
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘ইসফাহান কোনো সাধারণ শহর নয়, এটি ছাদবিহীন একটি জাদুঘর। এর আগে আফগান যুদ্ধ, মোগল বিজয় এমনকি ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও এমন কিছু ঘটেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি একটি সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। যার সংস্কৃতি নেই, সে সংস্কৃতির প্রতীককে গুরুত্ব দেয় না। যার ইতিহাস নেই, সে ইতিহাসের চিহ্নকে সম্মান করে না। যার পরিচয় নেই, সে পরিচয়ের মূল্য বোঝে না।’
ইসফাহানে বহু বছর কাজ করা এক ইরানি ভূতত্ত্ববিদ জানান, এই প্রাচীন রাজধানী বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘ইসফাহান বহুদিন ধরে ভূমিতল দিয়ে আক্রান্ত হচ্ছে। ভূমি ধসের কারণে সাফাভি যুগের স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আর এখন ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাচ্ছে। আজ মনে হচ্ছে ইসফাহানের বন্ধু আগের তুলনায় অনেক কম।’
হেগ কনভেনশন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ব্লু শিল্ডের মার্কিন কমিটি এক বিবৃতিতে জানায়, ইরানের ঐতিহাসিক স্থানগুলো ‘শুধু ইরানি জনগণের নয়, সমগ্র মানবজাতির সম্পদ।’
বিবৃতিতে সংস্থাটি আরও জানায়, ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস হলে তা আর ফেরত পাওয়া যায় না। এটি সভ্যতার পরিচয়, ইতিহাস ও সম্মিলিত স্মৃতি মুছে দেয়। মানবজাতির এই যৌথ সম্পদ ইচ্ছাকৃত বা অবহেলার মাধ্যমে ধ্বংস করার মতো কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক লক্ষ্য থাকতে পারে না।’


