দেশের সড়কে গত কয়েক বছরে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। দ্রুতগতির এই বাহন একদিকে যেমন নাগরিক যাতায়াতে গতি এনেছে, অন্যদিকে রাইড শেয়ারিং সেবার প্রসার ঘটিয়ে তৈরি করেছে কর্মসংস্থান। তবে এই গতির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি। নিম্নমানের এবং অস্বাস্থ্যকর হেলমেটের ব্যাপক ব্যবহার এখন সড়কে নিরাপত্তার বদলে মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারা দেশে রাইড শেয়ারিং সেবায় নিয়োজিত চালকদের দেওয়া হেলমেটগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, এগুলোর বেশিরভাগই অত্যন্ত সস্তা, ওজনে হালকা এবং কোনো স্বীকৃত ব্র্যান্ডের নয়। সাধারণ হাত থেকে পড়ে গেলেই এগুলো ফেটে যায়, ফলে বড় কোনো দুর্ঘটনায় এগুলো জীবন রক্ষায় কোনো ভূমিকাই রাখতে পারে না। চালক ও যাত্রী উভয়ই স্বীকার করেছেন, নিরাপত্তার চেয়ে পুলিশের জরিমানা থেকে বাঁচতেই মূলত এসব হেলমেট ব্যবহার করা হয়।
গত সাত বছর ধরে রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত চালক ইসমাইল বলেন, “হেলমেট না থাকলে আমাদের জরিমানা করা হয়। তাই সাধ্যের মধ্যে যা পাই, তা-ই কিনি। কোম্পানিগুলোও হেলমেটের মান নিয়ে কোনো কড়াকড়ি করে না।”
রাস্তার দৃশ্যও এর সপক্ষে কথা বলে। অনেক যাত্রীকে দেখা যায় ভাঙা শেল, ঢিলেঢালা প্যাডিং বা ছেঁড়া ফিতার হেলমেট পরে যাতায়াত করছেন। অনেক ক্ষেত্রে হেলমেটগুলো মাথায় ঠিকমতো বসে না, ফলে যাত্রীকে এক হাত দিয়ে হেলমেট ধরে রাখতে হয় অথবা শুধু নিয়ম রক্ষার জন্য ফিতায় গিঁট দিয়ে যাত্রা শেষ করতে হয়।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এ ধরনের দায়সারা ব্যবস্থা হেলমেটকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করেছে।
রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়সহ বিভিন্ন বাজারে মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় উজ্জ্বল রঙের ‘প্রিমিয়াম’ হেলমেট বিক্রি হয়। অথচ এগুলোতে আইএসআই (ভারত), ডট (যুক্তরাষ্ট্র) বা ইসিই (ইউরোপ)-এর মতো কোনো স্বীকৃত নিরাপত্তা সনদ নেই। উন্নত মানের সুরক্ষাকারী ফোমের বদলে এগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে সস্তা থার্মোকল। দোকানদারদের মতে, রাইড শেয়ারিং চালকরাই এসব সস্তা হেলমেটের প্রধান ক্রেতা।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মাহমুদ ওমর ইমাম বলেন, বাজারে থাকা অনেক হেলমেট দেখতে আকর্ষণীয় হলেও সেগুলো নিরাপত্তার মানদণ্ড পূরণ করে না। দুর্ঘটনার সময় এগুলো সহজেই ভেঙে যায়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে হেলমেটের ভাঙা অংশ মাথার ভেতরে ঢুকে গিয়ে আঘাতকে আরও গুরুতর করে তুলতে পারে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিওটি বা ডট, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইসিই এবং ভারতের আইএসআই সনদপ্রাপ্ত হেলমেট ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। বাংলাদেশে আইএসআই বা ডট স্ট্যান্ডার্ডের হেলমেট আইনত স্বীকৃত। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। দেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কেবল হেলমেট পরা আছে কি না, সেটুকুই পরীক্ষা করে, মান যাচাই করে না।
সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, চালক ও যাত্রী উভয়ের জন্য সঠিকভাবে হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক। এই আইন অমান্য করলে তিন মাসের জেল অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া ‘নো হেলমেট, নো ফুয়েল’ নীতিও কার্যকর রয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে হেলমেট ব্যবহারের হার বাড়লেও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা কমেনি।
বিআরটিএ-র তথ্যমতে, ২০২৪ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এক হাজার ৭০০ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩১ দশমিক ১৩ শতাংশ। তবে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে এই সংখ্যা দুই হাজার ৬০৯ জন। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য বলছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃতদের ৮৮ শতাংশই হেলমেট না পরা বা নিম্নমানের হেলমেটের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারে মৃত্যুঝুঁকি ৪০ শতাংশ এবং গুরুতর আহতের ঝুঁকি ৭০ শতাংশ কমানো সম্ভব।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হারুন অর রশিদ বলেন, “আমাদের কাছে আসা গুরুতর আহত রোগীদের একটি বড় অংশই নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহারকারী ছিলেন। মানহীন হেলমেট পরা আর না পরা প্রায় সমান কথা।”
বিআরটিএ জানিয়েছে, তারা বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে হেলমেটের মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে এবং দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মানহীন হেলমেট ধ্বংসও করা হচ্ছে। তবে একটি সমন্বিত যাচাই ব্যবস্থার অভাবে বাজারে সস্তা ও ভুয়া পণ্যের দাপট থামছে না।
নিরাপত্তার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। রাইড শেয়ারিংয়ের হেলমেটগুলো প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ব্যবহার করেন। এতে ঘাম, ধুলাবালি এবং ব্যাকটেরিয়া জমে থাকে, যা কখনোই পরিষ্কার করা হয় না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, একই হেলমেট একাধিক ব্যক্তি ব্যবহারের ফলে একজনের শরীর থেকে জীবাণু অন্যজনে ছড়াতে পারে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি।
বর্তমানে মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশ চালক নিজ উদ্যোগে ভালো মানের হেলমেট ব্যবহার করছেন। জীবনের ঝুঁকি আর স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মানহীন ও নোংরা হেলমেটের এই ‘মরণফাঁদ’ থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি।


