মেট্রোরেলের কারিগরি ত্রুটি: মাশুল গুনছেন সাধারণ যাত্রীরা

মেট্রোরেলের কারিগরি ত্রুটি: মাশুল গুনছেন সাধারণ যাত্রীরা
ফাইল ছবি।
Advertisement
Advertisement

রাজধানীর যানজটমুক্ত যাতায়াতের অন্যতম ভরসা মেট্রোরেল এখন অনেক যাত্রীর কাছেই ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্সিট গেটের কারিগরি ত্রুটির কারণে নিয়মিত জরিমানা গুনতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের অসতর্কতার কথা বললেও ভুক্তভোগীরা বলছেন, সিস্টেমের সীমাবদ্ধতার দায় চাপানো হচ্ছে তাদের ওপর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান নিয়মিত ক্যাম্পাস স্টেশন থেকে মিরপুর-১০ পর্যন্ত যাতায়াত করেন। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তিনি নিয়ম মেনে কার্ড পাঞ্চ করে স্টেশন থেকে বের হলেও পরদিন স্টেশনে প্রবেশের সময় তার কার্ডটি কাজ করেনি। কর্তব্যরত কর্মকর্তারা জানান, আগের দিন তিনি স্টেশন থেকে বের হননি সিস্টেমে এমন তথ্য দেখাচ্ছে। ফলে তাকে ১০০ টাকা জরিমানা দিতে হয়।

সোহানুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি সঠিক নিয়মেই কার্ড পাঞ্চ করেছিলেন। কিন্তু সিস্টেম রিড করতে না পারায় তাকে বিনা কারণে এই অর্থদণ্ড দিতে হলো।

একই অভিজ্ঞতার শিকার সরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, এক্সিট গেটে কার্ড পাঞ্চ করলেও প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে মেশিন তার বের হওয়ার তথ্য সংরক্ষণ করেনি। পরবর্তী যাত্রার সময় তাকেও জরিমানা গুনতে হয়।

রফিকুল ইসলামের প্রশ্ন, কর্তৃপক্ষ বলছে তার বের হওয়ার তথ্য নেই, এর মানে কি তিনি সারারাত স্টেশনে ছিলেন? নিজের পকেট থেকে টাকা যাওয়ায় তিনি কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করেন।

উত্তরা উত্তর স্টেশনের নিয়মিত যাত্রী শিক্ষক শিমুল আহমেদও একই সুরে বলেন, বর্তমানে মেট্রোরেলে সুবিধার চেয়ে ভোগান্তিই বেশি হচ্ছে। তিনি নিজেই তিনবার এমন অনাকাঙ্ক্ষিত জরিমানা দিয়েছেন বলে জানান।

আরও পড়ুন

তবে দায় নিতে নারাজ মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের  (ডিএমটিসিএল) অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বিভাগের পরিচালক নজরুল ইসলাম বলেন, যাত্রীরা অনেক সময় দ্রুত বের হয়ে যাওয়ার কারণে মেশিন কার্ডটি সঠিকভাবে রিড করার পর্যাপ্ত সময় পায় না। তিনি যাত্রীদের কার্ড পাঞ্চ করার পর কনফার্মেশন সাউন্ড শোনা পর্যন্ত অপেক্ষা করে স্টেশন ত্যাগ করার পরামর্শ দেন।

আগে নিয়ম ছিল কোনো যাত্রী ভুলবশত বা প্রয়োজনে ১৫ মিনিটের মধ্যে একই স্টেশন থেকে বের হয়ে গেলে কোনো টাকা কাটত না। তবে এমআরটি পাস বা র‍্যাপিড পাস ব্যবহারকারী একটি চক্র এই সুবিধার অপব্যবহার করে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে বিনা ভাড়ায় যাতায়াত করছিল। কর্তৃপক্ষের আর্থিক ক্ষতি ঠেকাতে গত বছরের ২০ অক্টোবর থেকে ডিএমটিসিএল এই ‘বিনা ভাড়ায় এন্ট্রি-এক্সিট’ সুবিধা বন্ধ করে দেয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একই স্টেশনে কার্ড স্ক্যান করে প্রবেশ ও বের হলে ১০০ টাকা জরিমানা কাটা হয়।

একটি চক্রের অপব্যবহারের শাস্তি সাধারণ যাত্রীদের ওপর আসায় ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

জরিমানার অংকের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমানে উত্তরা-উত্তর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত একদিকের ভাড়ার সমপরিমাণ টাকা জরিমানা হিসেবে নেওয়া হয়। আগে এটি জরিমানাসহ দ্বিগুণ ছিল, যা যাত্রীদের কথা বিবেচনায় রেখে এখন অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে নিম্নমানের সরঞ্জাম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান জানান, জাপানিজ ঠিকাদারদের কাছ থেকে যে মানের এএফসি গেট বুঝে নেওয়ার কথা ছিল, তা নিশ্চিত করা হয়নি। স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী এক লাখ যাত্রীর বিপরীতে মাত্র একজনের ক্ষেত্রে ত্রুটি হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা অহরহ ঘটছে।

তিনি বলেন, মেশিনের সমস্যার কারণে যাত্রীদের জরিমানা করা এক ধরনের অপরাধ। যাত্রীরা সচেতন এবং তারা জানেন পাঞ্চ না করলে জরিমানা দিতে হবে। তাই ঢোকার সময় পাঞ্চ করলে বের হওয়ার সময় করবেন না—এমন ধারণা সঠিক নয়।

অধ্যাপক হাদিউজ্জামানের মতে, কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত এই মেশিনগুলো মেরামত করা এবং একই সাথে যাত্রীদের সচেতন করা, অন্যথায় এই অযৌক্তিক জরিমানা চলতেই থাকবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad