আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারকারী সশস্ত্র মাদক কারবারি ও চোরাকারবারিদের শক্ত হাতে দমনে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণসহ নাইন এমএম পিস্তল ও আধুনিক অস্ত্র দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি জানান, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দেশকে জুয়া ও মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, ‘দেশের সম্ভাবনাময় ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ বিনির্মাণে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে তরুণ সমাজকে অবশ্যই মাদকমুক্ত রাখতে হবে। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্যতম অঙ্গীকার ছিলো দেশের যুব সমাজকে মাদক ও জুয়ার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করা। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি।’
শুক্রবার ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৬’ উপলক্ষ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আয়োজিত আলোচনাসভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে, যেখানে কর্মক্ষম যুব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সর্বোচ্চ। এই অমিত সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করতে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নে দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সশস্ত্র মাদক কারবারিদের সঙ্গে লড়াই করছেন, কিন্তু তাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই’ উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এই আইনগত শূন্যতা ও আধুনিক চ্যালেঞ্জ দূর করতে আগামী ২-১ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদে “মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী বিল” উত্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে এই বাহিনীকে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন অংশ হিসেবে শক্তিশালী করা হবে।’
আদালতে বিচারাধীন মাদক মামলার জট প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, ‘কেবল ঢাকাতেই প্রায় ৮০ হাজার মাদকের মামলা পেন্ডিং রয়েছে। বিচারক স্বল্পতার কারণে এই বিপুল সংখ্যক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি উত্তরণে সংশোধিত আইনে মামলার সংখ্যা বিবেচনায় যেখানে প্রয়োজন, সেখানে মাদকের দ্রুত বিচার নিশ্চিতে “বিশেষ ট্রাইব্যুনাল” স্থাপনের কঠোর বিধান রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া মাদক নিখুঁতভাবে শনাক্তকরণের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে আধুনিক “ডগ স্কোয়াড” সংযোজন এবং সিআরপিসি অনুযায়ী আসামি গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়ার অন্তর্বর্তী সময়ে রাখার জন্য “হাজতখানা” স্থাপনের আইনি প্রস্তাব করা হয়েছে।’
মাদকের রাসায়নিক পরীক্ষার জালিয়াতি রুখতে দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে উন্নত কেমিক্যাল ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হবে বলেও তিনি জানান।
বর্তমানে মাদক ও জুয়ার অপরাধসমূহ সাইবার স্পেস এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হয়েছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মাদক পাচারকারী চক্র বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থার আড়ালে তরুণ সমাজকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে।
‘১৮৬৭ সালের প্রাচীন জুয়া প্রতিরোধ আইন দিয়ে বর্তমান যুগের আধুনিক অনলাইন বেটিং ও ক্রিপ্টো-অপরাধ দমন সম্ভব নয়’ উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে বেনামী সিমের মাধ্যমে ওটিপি ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে যে অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিং হচ্ছে, তা কঠোরভাবে ট্র্যাকিংয়ের জন্য এনটিএমসির পরামর্শে আইনি কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।’
‘সরকার শুধু খুচরা বিক্রেতা বা বহনকারীদের ধরপাকড়েই সীমাবদ্ধ নয় বরং মাদক ব্যবসার মূল হোতা, অর্থ জোগানদাতা বা গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ’ বলেও প্রতিশ্রুতি দেন মন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মাদকের কালো টাকা দিয়ে অর্জিত সমস্ত অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার জন্য নতুন সংশোধনীতে কঠোর ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। “মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮” এবং “মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২” এর আওতায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এরইমধ্যে এ ধরনের নয়টি মানি লন্ডারিং মামলা করেছে এবং আরও ২৩টি গুরুতর অনুসন্ধান বর্তমানে চলমান রয়েছে।’
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড, র্যাব ও পুলিশের সমন্বিত ভূমিকার প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকার উত্তরার মতো জায়গায় জঘন্যতম সিনথেটিক ড্রাগ ‘কিটামিন’-এর ল্যাবরেটরি আবিষ্কার হওয়া প্রমাণ করে অপরাধীরা কতখানি আধুনিক। প্রথাগত মাদকের পাশাপাশি নতুন সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদক বা ‘নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্টেন্সেস’ এর প্রাদুর্ভাব মাদকাসক্তির ঝুঁকিকে আরও ঘনীভূত করেছে। তাই আমাদের আইনকেও অত্যাধুনিক করতে হবে।’
‘মাদকাসক্তি একটি মারাত্মক মানসিক ও শারীরিক ব্যাধি। যারা এর ফাঁদে পড়েছেন, তারা সমাজ বা রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী নন, বরং তারা রোগী। তাই তাদের সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে বিভাগীয় পর্যায়ে ২০০ শয্যার সরকারি নিরাময় কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা এবং মনো-সামাজিক কাউন্সেলিং জোরদার করা হয়েছে’, যোগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
মন্ত্রী আরও বলেন, মাদক কোনো একক দেশের বা একক সংস্থার পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন। তিনি দেশের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ এবং সকল স্বেচ্ছাসেবী ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।
এর আগে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন প্রাঙ্গণে স্থাপিত মাদকবিরোধী বিশেষ স্টল পরিদর্শন করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। অনুষ্ঠানে মাদকবিরোধী জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের থিম সং প্রদর্শন করা হয়।


