হিউস্টন স্টেডিয়ামে প্রায় ৬৯ হাজার দর্শকের সামনে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। বাংলাদেশ সময় বুধবার রাতে যোগ করা সময়ে ইওয়ানে উইসার দুর্দান্ত হেডে পর্তুগালের বিপক্ষে ১-১ গোলের অভাবনীয় এক ড্র তুলে নিয়েছে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব দ্য কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো)।
তবে প্রথম রাউন্ডের এই বীরত্বগাথার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে পর্তুগিজ অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে তৈরি হওয়া নতুন বিতর্ক। ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা পুরো ৯০ মিনিট মাঠে থাকলেও তার পারফরম্যান্স সমালোচকদের সেই দাবিকেই জোরালো করেছে যে পর্তুগালের এবারের বিশ্বকাপ অভিযানে রোনালদো আর আগের মতো অপরিহার্য নন।
ম্যাচের শুরুতেই অবশ্য চেনা ছন্দে ছিল পর্তুগাল। ষষ্ঠ মিনিটে পেড্রে নেতোর বাড়ানো ক্রস থেকে দারুণ হেডে দলকে এগিয়ে নিয়েছিলেন জোয়াও নেভেস। প্রথমার্ধের খেলা এই ১-০ ব্যবধানেই শেষ হয়। কিন্তু হাল ছাড়েনি কঙ্গো। দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে পর্তুগাল বলের নিয়ন্ত্রণে একক আধিপত্য দেখালেও বলার মতো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। উল্টো ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে আর্থার মাসুয়াকুর ক্রস থেকে চমৎকার এক হেডে কঙ্গোকে মূল্যবান ১ পয়েন্ট এনে দেন উইসা। টুর্নামেন্টে নিজেদের ৩২তম প্রচেষ্টায় এটি ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসে কঙ্গোর প্রথম গোল। পুরো ম্যাচে রেকর্ড ৭২৪টি পাস খেললেও নেভেসের করা সেই গোলটিই ছিল পর্তুগালের লক্ষ্যে থাকা একমাত্র শট।
পুরো সন্ধ্যা জুড়ে রোনালদো যে শুধু অকার্যকর ছিলেন তা নয়, পরিসংখ্যান বলছে তিনি মাঠে একপ্রকার অনুপস্থিত ছিলেন। ৪৫ মিনিটের বেশি খেলা পর্তুগালের ফুটবলারদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে কম মাত্র ২৫ বার বল স্পর্শ করেছেন। বল পায়ে তার করা ছয়টি ড্রিবলিংয়ে তিনি মোটে ৪৯.৪ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পেরেছেন, যা মাঠে প্রতিপক্ষের ওপর আধিপত্য বিস্তারকারী কোনো ফুটবলারের নয়, বরং ডি-বক্সের ভেতরে থাকা একজন স্ট্রাইকারের ছোটখাটো মুভমেন্টের পরিসংখ্যান। ২১টি পাসের মধ্যে ১৯টি সফল করলেও সতীর্থদের জন্য একটিও গুরুত্বপূর্ণ পাস বা ক্রস দিতে পারেননি তিনি।
ডি-বক্সের ভেতর থেকে নেওয়া তার তিনটি শটের একটিও প্রতিপক্ষের গোলরক্ষককে পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি। তার এক্সপেক্টেড গোল বা সম্ভাব্য গোলের হার ০.৪৬ হলেও শট ভ্যালু ছিল মাইনাস ০.৭৭, যা মূলত তার শটগুলোর দুর্বল দিকনির্দেশনাকেই ফুটিয়ে তোলে।
দ্বিতীয়ার্ধে গোললাইনের পাশ থেকে আসা দুটি নিশ্চিত কাটব্যাক তিনি পোস্টের বাইরে মারেন। ফক্স স্পোর্টসে এই সুযোগটির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি উল্লেখ করেন, রোনালদো নিজে শট না খেলে সিক্স-ইয়ার্ড বক্সের ভেতর পাস বাড়ালে ব্রুনো ফার্নান্দেস খুব সহজে ফাঁকা পোস্টে গোল করতে পারতেন। মাঠে রোনালদোর নেওয়া সেই সিদ্ধান্তটি দলের চেয়ে নিজের গোলসংখ্যা বাড়ানোর মানসিকতাকেই যেন প্রকাশ করছিল।
তবে সবচেয়ে দৃষ্টিকটু মুহূর্তটি আসে যখন ফার-পোস্টে একটি চমৎকার ক্রস ভেসে আসে। এক দশক ধরে দুর্দান্ত টাইমিং আর পাওয়ারে লাফিয়ে উঠে গোল করার জন্য বিখ্যাত রোনালদো এবার মাটি ছেড়েই উঠলেন না। কঙ্গোর ডিফেন্ডার চ্যান্সেল এমবেম্বা খুব সাধারণ এক হেডে বলটি ক্লিয়ার করেন। লাফ দেওয়ার শারীরিক সক্ষমতার অভাব নাকি কেবলই মনোযোগের ঘাটতি, কারণ যা-ই হোক না কেন, মাঠের এই দৃশ্যটি এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব ছিল।
ম্যাচ শেষে রোনালদো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও সংবাদমাধ্যমে আত্মবিশ্বাসী সুর ধরে রাখলেও কঙ্গোর মিডফিল্ডার এনগালায়েল মুকাউ সত্যের অনেকটাই কাছাকাছি চলে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি তিনি আগের মতো নেই, তাই আমরা জানতাম তিনি মাঠে দৌড়াদৌড়ি কম করবেন। এটি খুবই স্বাভাবিক, তার বয়স কিছুটা হয়েছে। রোনালদোর বিরুদ্ধে খেলার পর প্রতিপক্ষের একজন খেলোয়াড়ের এমন মন্তব্য তার বর্তমান ফর্মের জন্য একটি বড় চপেটাঘাত।’
পরিসংখ্যান বলছে, এটি বড় টুর্নামেন্টগুলোতে যেমন বিশ্বকাপ ও ইউরোতে টানা দশম ম্যাচ যেখানে রোনালদো কোনো গোল করতে ব্যর্থ হলেন। পেনাল্টি ছাড়া বড় মঞ্চে তার সর্বশেষ গোলটি এসেছিল দীর্ঘ পাঁচ বছর আগে। ৪১ বছর বয়সে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে আসা রোনালদোর এই উপস্থিতি দলের সাফল্যকে সীমিত করে দিচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন কোচ রবার্তো মার্তিনেসের সামনে।
রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর দেখা গেল এক প্রতীকী দৃশ্য। দলের বাকি সদস্যরা যখন মাঠের মাঝবৃত্তে ফিরে গিয়ে গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানাচ্ছিলেন, রোনালদো তখন একা একা টানেলের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। মাঝপথে কিছুটা থমকে সতীর্থ ও প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সাথে করমর্দন করলেও শেষ পর্যন্ত একাই টানেল দিয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি। এই একটি দৃশ্যই যেন পর্তুগাল জাতীয় দলে তাঁর বর্তমান অবস্থানের বাস্তব চিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছে। দল থেকে কিছুটা দূরে, কিছুটা পেছনে এবং ইতিমধ্যেই অন্য কোনো গন্তব্যের দিকে পা বাড়ানো এক নিঃসঙ্গ পথিক।


