মনের চোখে পরিবেশের কান্না দেখেন শরিফুল

মনের চোখে পরিবেশের কান্না দেখেন শরিফুল
ভাড়া দোকানে শরিফুল ইসলাম। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

গাইবান্ধার শরিফুল ইসলাম। পৃথিবীতে এসেছেন চোখের আলো ছাড়াই। তবে মনের আলোতে তিনি ছাড়িয়ে যাচ্ছেন অন্যদের।

নিত্যদিন শেষ হওয়া লাখ লাখ প্লাস্টিকের কলম ফেলে দেওয়ার কারণে যে ক্ষতি হচ্ছে, সেখান থেকে পরিবেশ রক্ষায় খুবই ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। নিয়ে এসেছেন পরিবেশবান্ধব এক কলম, যেটি কালি শেষে মিশে যায় মাটিতে। এই কলম নিজ এলাকা গাইবান্ধা তো বটেই, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য খুবই ভয়ঙ্কর। তাই পরিবেশের কথা চিন্তা করেই এই কলম তৈরির উদ্যোগ নিই।’

গাইবান্ধা শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে বোয়ালী ইউনিয়নের উত্তর ফলিয়া গ্রামে তার বাড়ি। সেখানেই দিনের একটি বড় অংশ কাটে কলম তৈরির কাজে। দুই হাতের ছোঁয়ায় মুহূর্তেই তৈরি করে ফেলেন এই লেখার উপকরণ।

স্বল্প আয়ের একটি পরিবারে জন্ম। বিরুদ্ধ পরিবেশেও পড়াশোনা থামাননি। বাড়ি থেকে সোয়া পাঁচশ কিলোমিটার দূরের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে শেষ করেছেন স্নাতকোত্তর। এরপর বাড়িতে ফিরে শিক্ষা উপকরণ তৈরি করছেন।

তার বাবা রফিকুল ইসলাম একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। করোনাভাইরাস মহামারির সময় তিনি ব্যবসার পুঁজি হারিয়ে ফেলার উপক্রম হন। সেই কঠিন সময়ে ২০২৩ সালে এই কলম ও খাতা তৈরির শুরু করেন শরিফুল। তার সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা। শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার এই কলম ও খাতা সাড়াও ফেলে।

এখন প্রতি মাসে গড়ে এক হাজার কলম ও ৫০০ খাতা বিক্রি করেন শরিফুল ইসলাম। খাতার দাম ২০ থেকে ৪০ টাকা, কলম ১০ টাকা। গাইবান্ধা শহর থেকে এক কিলোমিটার দূরে পুলবন্দি বাজারে ছোট একটি দোকান ভাড়াও নিয়েছেন শরিফুল।

আরও পড়ুন

তার কলম তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ। বিভিন্ন রঙের কাগজের মধ্যে কালির শীষ পেঁচিয়ে আঠা দিয়ে ভালোভাবে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর সেটি রোদে শুকিয়ে শক্ত করা হয়।

শরিফুল জানান, যশোরের নাসিমা আক্তার এই ধরনের কাগজের কলম এনেছেন বলে জানতে পেরে প্রথমে তার কাছ থেকে কলম আনান তিনি। পরে নাসিমার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে নিজেও তৈরি করা শুরু করেন।

কলম তৈরি করছেন শরিফুল। ছবি: টাইমস

তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিকের কলমে ঘামে পিচ্ছিল হয়ে যায়। যারা দীর্ঘ সময় তিন বা চার ঘণ্টার পরীক্ষা দেয়, তাদের সমস্যা হয়। এই কলমে ঘাম শোষণ হয় বলে সেটি পিচ্ছিল হয় না। ফলে ছাত্ররা দীর্ঘ সময় অস্বস্তি ছাড়াই পরীক্ষা দিতে পারে।’

এতে যে আয় খুব বেশি হয় এমন নয়। একেকটি কলম তৈরিতেই খরচ হয় ৭ টাকার মতো, অর্থাৎ লাভ থাকে তিন টাকা। শতকরা হিসাবে মুনাফা ভালো হলেও হাতে হাতে আর দিনে কতগুলোই বা কলম তৈরি করা যায়? শরিফুল জানান, মাসে দুই বা তিন হাজার টাকার মধ্যেই আয় থাকে। আর বাবার ব্যবসার আয়ের ওপরেই তাকে নির্ভর করতে হয়।

শরিফুলের এই চেষ্টা কেবল ব্যবসা নয়, পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে চলার প্রেরণার নামও।

গাইবান্ধা ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে এসএসসি ও দুই বছর পর গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। সেখান থেকে ২০২৩ সালে সমাজতত্ত্ব থেকে স্নাতক এবং দুই বছর পর একই বিষয়েই স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান বলেন, ‘শরিফুল ইসলাম আমাদের জীবনে বাস্তব এক জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি দৃষ্টিহীন হয়েও সব বাধা পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন।’

কলেজ শিক্ষক হারুন অর–রশিদ বলেন, ‘শরিফুল খুবই নম্রভদ্র ছেলে। তিনি তার মতো করে পরিবেশ রক্ষায় চেষ্টা করে যাচ্ছেন, এটা গর্ব করার মতো।’

গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবুজ কুমার বসাক বলেন, ‘শরিফুলের ব্যবসার উন্নতির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যত ধরনের সুযোগ–সুবিধা দেওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করা হবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad