আট দলের সমন্বিত প্রার্থী তালিকায় ছয় বিভাগে জামায়াতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বরিশালের এবং খুলনা বিভাগের কিছু এলাকায় বিশেষ প্রাধান্য পাচ্ছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা। এ ছাড়া অন্য ছয় দলের জনপ্রিয় প্রার্থীদেরকে তালিকায় রেখে আট দলের আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হচ্ছে।
সারা দেশে এসব দলের কমপক্ষে ৭ আসনে অমুসলিম ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রার্থী এবং ৫ আসনে নারী প্রার্থীরা স্থান পাচ্ছেন বলেও দলগুলোর একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সমমনাদের শক্তি কাজে লাগিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসনে জেতার টার্গেটে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করছে আট দল। কে কতটি আসন পাচ্ছে তার চেয়ে ইসলামী দলগুলোর ভোট যেন ‘এক বাক্সে’ পাঠানো যায় তা নিশ্চিতে জোর দেওয়া হচ্ছে।
আটটি দলের মধ্যে ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলার সক্ষমতা রয়েছে জামায়াত ইসলামী ও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের। দল দুটির আসন সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন করায় আগামী নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব পড়তে পারে।
আসন সমঝোতা যুক্ত হওয়া অন্য ৬ দলে রয়েছে–বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি। শেষ মুহূর্তে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) তাদের সঙ্গে আরও দুই থেকে তিনটি রাজনৈতিক দল যুক্ত হতে পারে।
দলগুলোর নেতারা বলছেন, বেশিরভাগ দল যার যার মতো প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে থাকলেও তফসিল ঘোষণার দুই দিন আগে বা দুই-এক দিন পরে জোটগতভাবে প্রতি আসনে একজনকে চূড়ান্ত করা হবে। ইসি ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তফসিল ঘোষণা করতে পারে বলে জানিয়েছে। তাই দলগুলো ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই প্রার্থী তালিকা প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মো. ফয়জুল করীম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘যে দলের যে এলাকায় জনপ্রিয়তা বেশি সেখানে তাদেরকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বরিশালে যেমন আমাদের অবস্থান ভালো আবার চট্টগ্রাম, রাজশাহী এমনকি সাতক্ষীরা ও আশপাশের কয়েকটি আসনে জামায়াতের অবস্থান ভালো। সেখানে তাদেরকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের দুই দলের বাইরের দলগুলোর যেখানে অবস্থান ভালো সে দলের প্রার্থীকে সেখানে মনোনয়ন দেওয়া হবে।’
নেতারা স্বীকার না করলেও দলগুলোর বিশেষ সূত্র বলছে, জামায়াতকে ১৬০ আসনে, ইসলামী আন্দোলন ৭০ আসনে, মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং আহমদ আব্দুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিসসহ অন্য ছয় দলের জনপ্রিয় ৪০ জনকে জোটগতভাবে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে আলোচনা চলছে।
বিশেষ চমক দেখাতে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, অমুসলিম এবং বিশেষ সম্প্রদায়ের ১০ জনকে মনোনয়ন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ইসলামি দলগুলোর। তবে, সমঝোতায় নতুন কোন দল আসন সমঝোতায় আসলে হিসাব নিকাশ পরিবর্তন হতে পারে। সেক্ষেত্রে ২০ আসন শেষ সময় পর্যন্ত হাতে রাখছে দলগুলো। এ ছাড়া কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদেরকে নিয়েও রয়েছে আলোচনা।
আসন সমঝোতায় যুক্ত একটি দলের একজন শীর্ষ নেতা বলেছেন, বরিশাল বিভাগের ২১ আসনের মধ্যে ইতোমধ্যে ইসলামী আন্দোলনকে ১১টি আসন এবং জামায়াতসহ অন্য সাত দলকে ১০টি আসনের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার ২০ আসনে জামায়াত ১৩টি, অন্যরা ৭টি, সিলেট বিভাগের ১৯টির মধ্যে জামায়াত ১২টি এবং সাত দলকে ৭টি আসন, খুলনা বিভাগের ৩৬ আসনে জামায়াত ২২ আসন এবং বাকি সাত দলকে ১৪ আসনে ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে। এভাবে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরার চারটি এবং যশোরের ছয়টি আসনের সব কয়টি জামায়াতকে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এখানে দলটির বেশিরভাগ প্রার্থী বেশ জনপ্রিয় এবং জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ টাইমসকে বলেন, ‘তফসিলের আগেই আমাদের সঙ্গে থাকা দলগুলোর জনপ্রিয় প্রার্থীদের সমন্বয়ে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। ভালো প্রার্থী পেলে অসুমলিদেরও প্রার্থী করা হবে। তফসিলের দুই-এক দিন আগে বা পরে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হতে পারে।’
আলোচনায় অমুসলিম প্রার্থী
ইসলামি দলগুলোর প্রার্থী তালিকায় বড় চমক রয়েছে অমুসলিমদের মনোনয়নের ক্ষেত্রে। অন্তত পাঁচজন হিন্দু এবং কমপক্ষে দুইজন উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। এসব প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী বিশেষ যোগাযোগ রাখছে।
খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনে প্রার্থী হতে পারেন কৃষ্ণনন্দী। তিনি জামায়াতে ইসলামী অমুসলিম শাখা খুলনার জেলা সভাপতি পদেও রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রী পরেশকান্তি সাহা জামায়াতে ইসলামী অমুসলিম শাখা মাগুরার জেলা সভাপতি। পেশায় তিনি চিকিৎসক। তিনি মাগুরা-২ আসনে প্রার্থী হতে পারেন বলে আলোচনায় এসেছে। অমুসলিম অধ্যুষিত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। মোকাবিলায় জামায়াত এমনটি চিন্তা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বেশ আগে থেকেই জামায়াত মাগুরা-১ আসনে চিকিৎসক শুশান্তকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা কথা শোনা যাচ্ছিল। পঞ্চগড়-১ আসনে প্রার্থী হতে পারেন শিক্ষক শ্রী তপনমোহন চক্রবর্তী। জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ্রী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিককে রাজবাড়ী বা ঢাকার যেকোনো আসন থেকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। ইতোমধ্যে তিনি জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যোগ দিচ্ছেন। এ ছাড়া ময়মনসিংহ-১ আসনে (হালুয়া-ধোবাউয়া) এবং রাঙ্গামাটিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রার্থী দেওয়ার কথা ভাবছে দলগুলো।
আলোচনায় নারীরা
যে কয়েকজন নারী প্রার্থী নিয়ে ভাবছে ইসলামি দলগুলো তাদের বেশিরভাগই জামায়াতের ইসলামী মহিলা সংগঠক। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি শিক্ষাবিদ অধ্যাপক নুরুন্নিসা সিদ্দিকার নাম রয়েছেন আলোচনায়। ঢাকা এবং অন্য যেকোনো আসন থেকে তাকে মনোনয়ন দেওয়ার আলোচনা চলছে।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজকে ঢাকা-১৮ আসন থেকে প্রার্থী করার গুঞ্জন রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য সংরক্ষিত আসনের সাবেক এমপি ডা. আমিনা রহমান, মহিলা বিভাগ জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশ শুরা সদস্য সাবেক এমপি শাহান আরা বেগম এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও জামায়াতের মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি ব্যারিস্টার সাবিকুন্নাহারের নামও আলোচনায় এসেছে। তাদেরও ঢাকার কোনো আসনে বা ঢাকার বাইরে প্রার্থী করা হতে পারে। এ ছাড়া অন্য দল থেকে যোগ্য যেকোনো এক বা দুইজনকে প্রার্থী করার আলোচনা রয়েছে।
জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী আরও প্রায় ৬ মাস আগেই ৩০০ আসনে প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে জোরাসোরে মাঠে রয়েছে। দলটির প্রার্থীদের বেশিরভাগ এবার নতুন। যাদের বড় অংশ নানান ক্ষেত্রে পেশাজীবী। দলটি সারা দেশে প্রাথমিক যে তালিকা করেছে তাতে ৭৮ শতাংশ প্রার্থী নতুন, যেখানে বিশেষ স্থান পেয়েছেন তরুণরা।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সব আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। দলটি দলীয় নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশার লোকজনকে প্রাধান্য দিয়েছে। জানা গেছে, আটটি দল জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ ৫ দফা দাবিতে প্রায় তিন মাস যুগপৎ আন্দোলনে রয়েছে। এখন তারা বিভাগীয় সমাবেশ করছে। আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভাগীয় সমাবেশ চলবে।
জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের তৃণমূলের নেতারা বলছেন, সবাই মিলে একজন প্রার্থীর পক্ষে কাজ করলে অভাবনীয় ফলাফল আসতে পারে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে সামনে আনছেন। ইতোপূর্বে যারা ক্ষমতায় ছিল তাদের অপশাসন আর চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে জনগণ নতুনত্ব চাইছে।


