ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ময়দানে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের এক নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিশ্বাস ও পরকালের ভয় দেখিয়ে ভোট চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিএনপির পাশাপাশি সাধারণ ভোটাররাও দলটির এমন প্রচারণার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
তবে জামায়াত নেতারা এই অভিযোগকে তাদের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক অপপ্রচার বলছেন। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাসুম ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, একটি পক্ষ নিজেদের চাঁদাবাজি ঢাকতে জামায়াতের নামে অপপ্রচার করছে। জামায়াতের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।
মাসুম আরও বলেন, যাদের সারাবছর ধর্মকর্মের খবর নেই তারা নির্বাচনের সময় ধর্মীয় লেবাস ধরে ভোটারদের ঠকাচ্ছে।
তবে জামায়াত নেতারা অস্বীকার করলেও মাঠের চিত্র ভিন্ন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ভোটাররা বলছেন, জামায়াত কর্মীরা ভোট পেতে বেহেশত ও গুনাহ মাফের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ধর্মভিত্তিক এই রাজনৈতিক দলটি মূলত মানুষের পবিত্র ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
গত ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হলেও প্রার্থীরা তার অনেক আগে থেকেই বাড়ি বাড়ি জনসংযোগ করছেন। স্থানীয় সমাবেশ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর দীর্ঘমেয়াদি চেষ্টা চালাচ্ছে জামায়াতের নেতাকর্মীরা।
গত ২৩ জানুয়ারি রাতে নওগাঁয় এক নির্বাচনী সভায় ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির বলেন, দাঁড়িপাল্লাকে জয়লাভ করানো সবার ঈমানি দায়িত্ব এবং দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়ে আল্লাহকে খুশি করতে হবে।
শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, মানুষ কবরেও আল্লাহকে বলতে পারবে তারা আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্য ভোট দিয়েছে। তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা এবং তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করেছে।
এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন থেকেও অভিযুক্ত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা গেছে। ঝালকাঠি-১ আসনের জামায়াত প্রার্থী ফয়জুল হককে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এক নির্বাচনী বৈঠকে ফয়জুল হক বলেন, কেউ ইবাদত না করলেও দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে আল্লাহ তাকে মাফ করতে পারেন। ধর্মীয় বিশ্বাসকে সরাসরি ভোটের সঙ্গে যুক্ত করায় নির্বাচন কমিশন একে আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।
বরগুনা-২ আসনে এক জনসভায় আফজাল হোসেন নামের এক বক্তা মুসলমানদের এই দেশে বিধর্মী প্রতিনিধির বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, আশি ভাগ মুসলমানের দেশে কোনো বিধর্মী সংসদ প্রতিনিধি কোনোভাবেই থাকতে পারে না। বক্তব্যটি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয় এবং বিএনপি এর কড়া প্রতিবাদ শুরু করে।
সিলেটে এক জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই বিতর্ককে এক নতুন রাজনৈতিক মাত্রা এনে দিয়েছেন। তিনি জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বলেন, একটি দল বেহেশতের টিকিট বিক্রি করছে। কিন্তু বেহেশত একমাত্র আল্লাহর হাতে। তারেক রহমান আরও যোগ করেন, বেহেশত অন্য কেউ দিতে পারে না; এটি নিয়ে রাজনীতি করা অনুচিত।
পরদিন খুলনায় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এই বক্তব্যের কড়া পাল্টা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সৌজন্য ও শিষ্টাচারবোধের জায়গা থেকে তারেক রহমানের এমন বক্তব্য দেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়।
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, একজন রাজনৈতিক নেতার ধর্মীয় ফতোয়ার মতো বক্তব্য দেওয়ার কোনো অধিকার নেই।
অভিযোগ রয়েছে, জামায়াতে ইসলামী মূলত নারী ভোটারদের টার্গেট করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছে। সমালোচকরা মনে করেন, ধর্মীয় বিশ্বাসকে ভোটের শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা রাজনৈতিক নৈতিকতার একটি বড় প্রশ্ন। এতে নাগরিক রাজনীতি দুর্বল হয় এবং ভোটাররা যুক্তির বদলে আবেগ ও ভয় দ্বারা চালিত হতে পারেন।
অন্যদিকে, জামায়াত সমর্থকদের দাবি, ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা দেখার সুযোগ নেই। কারণ, ধর্ম জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সব মিলিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ধর্ম ও রাজনীতির সীমারেখা নিয়ে একটি বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।


