ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি আসনে এগিয়ে আছে জামায়াতে ইসলামী। বড় দল বিএনপি এগিয়ে ১২টিতে, একটিতে এগিয়ে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী। বাকি পাঁচ আসনে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।
টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধানে স্থানীয় ভোটার ও বিশ্লেষকদের মতামতের ভিত্তিতে এমন তথ্য উঠে এসেছে। তবে, শেষ সময়ে ৬/৭টি আসনের ফলাফলে নাটকীয় পরিবর্তন হতে পারে। যার মধ্যে কোনো কোনো আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা আরও বেশি ভোট কাটলে সুবিধা পাবে জামায়াত। আবার কোনো কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী শেষ মুহূর্তে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে চলে গেলে বাড়তে পারে বিএনপির আসন।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সমর্থকরা বড় আকারে ভোটকেন্দ্রে গেলেও বেশ কয়েকটি আসনের ফলাফল বিএনপির অনুকূলে যেতে পারে।
জামায়াতের শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, খুলনা বিভাগে তাদের জোট এবার বিশেষ চমক দেখাবে। খুলনা বিভাগের ১০টির মধ্যে সাত জেলা দেখভাল করেন দলটির নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, সাত জেলার ২২টি আসনের বেশিরভাগই তারা জয়ের আশা করছেন।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্যে খুলনা বিভাগীয় বিএনপির সহসাংগঠননিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুন্ডুসহ একাধিক নেতার সঙ্গে বারবার চেষ্টা করা হলেও তারা কথা বলতে রাজি হননি।
আসনভিত্তিক পরিস্থিতি
খুলনা-১ আসনে আমির এজাজ খান বিএনপির প্রার্থী। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর কৃষ্ণ নন্দী। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসন হলেও কৃষ্ণ নন্দীর চেয়ে এগিয়ে আছেন বিএনপির এজাজ খান।
খুলনা-২ আসনে খুলনা বিভাগীয় বিএনপির প্রার্থী দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। স্থানীয়ভাবে তুমুল জনপ্রিয় মঞ্জু জামায়াত প্রার্থী শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালের চেয়ে এগিয়ে আছেন।
খুলনা-৩ আসনে কেন্দ্রীয় বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলের বিপরীতে জামায়াতের প্রার্থী মাহফুজুর রহমান। এখানেও এগিয়ে আছে বিএনপি।
খুলনা-৪ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আজিজুল বারী হেলাল লড়ছেন জামায়াত জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিস নেতা সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। এখানেও হেলাল বেশ এগিয়ে রয়েছেন।
খুলনা-৫ আসনে জামায়াত ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার দলটির প্রার্থী। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাবেক এমপি আলী আসাগর লবি। এখানে জামায়াত কিছুটা এগিয়ে আছে। তবে শেষ মুহূর্তে সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে হিন্দু ভোট।
খুলনা-৬ আসনে বিএনপি নেতা মনিরুল হাসান বাপ্পি ভোট করছেন জামায়াতের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী এগিয়ে থাকার তথ্য মিলেছে।
বাগেরহাট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী কপিলকৃষ্ণ মন্ডল ও জামায়াতের মশিউর রহমান খান। তবে এখানে স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন বিএনপির বিদ্রোহী নেতা এম এ এইচ সেলিম। এই আসনে জামায়াতের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করবেন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
বাগেরহাট-২ আসনে জামায়াতে ইসলামের মনজুরুল হক রাহাদের সঙ্গে বিএনপির শেখ জাকির হোসেনের ভোট হলেও এগিয়ে আছেন জামায়াত প্রার্থী।
বাগেরহাট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী শেখ ফরিদুল ইসলাম। অন্যদিকে, জামায়াতের প্রার্থী শেখ আব্দুল ওয়াদুদ। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও এখন পর্যন্ত এগিয়ে আছেন বিএনপি প্রার্থী।
বাগেরহাট ৪ আসনে জামায়াতে ইসলামের অধ্যক্ষ আব্দুল আলিমের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সোমনাথ দে। তবে, সোমনাথ দে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও দলে নতুন। তাই স্থানীয় বিএনপি তাকে মেনে নিতে না পারায় এগিয়ে আছেন জামায়াত প্রার্থী।
সাতক্ষীরা-১ আসনে আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিবের সঙ্গে জামায়াতের মো. ইজ্জত উল্লাহ মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তারা দুজনই দল দুটির কেন্দ্রীয় নেতা। এই আসনে এখন পর্যন্ত তালা উপজেলা বিএনপি আর কলারোয়া উপজেলায় জামায়াত প্রার্থী এগিয়ে থাকায় সমীকরণ জটিল।
সাতক্ষীরা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী জামায়াতের মুহাদ্দিস আব্দুল খালেকের সঙ্গে বিএনপি প্রার্থী আব্দুর রউফের ভোটযুদ্ধ হলেও জামায়াতের আব্দুল খালেক অনেক এগিয়ে। বিএনপির রউফ চাঁদাবাজি ও নানা দখলবাজির সঙ্গে জড়িয়ে বারবার পত্রিকার শিরোনাম হয়েছেন।
সাতক্ষীরা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী কাজী আলাউদ্দীন আর জামায়াতের প্রার্থী রবিউল বাশার। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শহিদুল আলম। দল মনোনীত প্রার্থীর চেয়ে বিদ্রোহী শহিদুল আলমের সমর্থন বেশি। একই দলের দুই প্রার্থী থাকায় এগিয়ে আছেন জামায়াত প্রার্থী।
সাতক্ষীরা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানের সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থী সাবেক এমপি জিএম নজরুল ইসলামের ভোটযুদ্ধ হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এগিয়ে আছেন জামায়াতের নজরুল ইসলাম।
যশোর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. নুরুজ্জামান লিটন তুলনামূলক কম জনপ্রিয় হওয়ায় এগিয়ে রয়েছেন জামায়াত প্রার্থী আজীজুর রহমান। এখানে প্রথমে বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে মনোনয়ন দেয়া হলেও সেটি প্রত্যাহার করায় তার বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক এখন নিষ্ক্রিয়।
যশোর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবিরা সুলতানা ও জামায়াতের মোহাম্মদ মোসলেহউদ্দিন ফরিদের সঙ্গে লড়াই হচ্ছে। তবে, জেলা বিএনপির কিছু নেতার নিষ্ক্রিয়তা ও অসহযোগিতার কারণে মোসলেহ উদ্দিন কিছুটা এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত লড়াই হবে তীব্র।
যশোর-৩ আসনে দলের বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বিএনপির প্রার্থী। তার সঙ্গে ভোট করছেন জামায়াতের ভিপি আব্দুল কাদের। তবে ষ্পষ্টভাবেই এগিয়ে আছেন বিএনপির অমিত।
যশোর-৪ আসনে জেলা জামায়াতের আমির গোলাম রসুলের সঙ্গে ভোট করছেন বিএনপির মতিয়ার রহমান ফারাজী। এই আসনে বিএনপির টিএস আইয়ুব মনোনয়ন পেলেও খেলাপি জটিলতায় তার মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় প্রার্থী পরিবর্তন করা হয়। দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনের একটি উপজেলায় বিএনপির বর্তমান প্রার্থীর জনপ্রিয়তা কম থাকায় জামায়াতের প্রার্থী এগিয়ে।
যশোর-৫ আসনে জমিয়তে ওলামা ইসলামের নেতা রশীদ আহমাদ বিএনপি জোটের প্রার্থী। প্রথমধাপে দলের মনোনয়ন পেয়েও বঞ্চিত হওয়া উপজেলা বিএনপির সদ্য বহিস্কৃত সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র শহীদ মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দলের বেশিরভাগ নেতাকর্মী তার সঙ্গে। বিএনপির ভোট ভাগ হওয়ায় এবং জামায়াতের প্রার্থী গাজী এনামুল হক এগিয়ে রয়েছেন। তার সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইকবাল হোসেনের লড়াই হবে।
যশোর-৬ আসনে জামায়াতের মোক্তার আলীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির আবুল হোসেন আজাদ। এই আসনেও প্রথমে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে মনোনয়ন দিয়ে পরে তাকে সরিয়ে আজাদকে মনোনয়ন দেয়ায় নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ নিষ্ক্রিয়। ফলে আসনটিতে এগিয়ে আছে জামায়াত।
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রাথী ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফের সঙেগে জামায়াত ইসলামীর প্রাথী মাসুদ পারভেজ রাসেলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে।
চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু। তিনি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিজিএমইএ’র সভাপতি। তিনি নিজে ক্লিন ইমেজের হলেও বিএনপির স্থানীয় নেতারা ব্যাপক চাঁদাবাজিতে যুক্ত হওয়ায় এখানে এগিয়ে আছেন জামায়াত প্রার্থী রুহুল আমিন।
নড়াইল-১ বিএনপির প্রার্থী বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম এগিয়ে থাকলেও খুব একটা স্বস্তিতে নেই। এই আসনে তিনজন বিদ্রোহী প্রার্থী। তারা ধানের শীষের ভোটে ভাগ বসালে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ওবায়দুল্লাহ কায়সারের ভালো করার সুযোগ রয়েছে।
নড়াইল-২ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী এনসিসি নেতা ফরিদুজ্জামান ফরহাদ হলেও বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা বিএনপি নেতা মনিরুল ইসলাম। তাদের ভোট ভাগাভাগিতে এগিয়ে আছেন জামায়াত প্রার্থী আতাউর রহমান বাচ্চু।
মাগুরা-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মনোয়ার হোসেন খান নির্বাচনী দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে। তার দলমত নির্বিশেষে তার বেশ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এখানে জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল মতিন।
মাগুরা-২ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী। তাকে নিয়ে স্থাণীয় বিএনপিতে কোন্দল আছে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মুশতারশেদ বিল্লাহ বাকের। এখানে ইসলামী আন্দোলনের ভাল ভোট ব্যাংক থাকায় তাদের প্রার্থী মুফতি মোস্তফা কামাল কত ভোট সংগ্রহ করতে পারবে তার ওপর নির্ভর করছে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর জয় পরাজয়।
কুষ্টিয়া-১ আসনে জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি ধানের শীষের প্রার্থী রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লার। তাকে জামায়াতের মো. বেলাল উদ্দীনের সঙ্গে লড়াই করতে হবে।
কুষ্টিয়া-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরীর সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল গফুরের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তবে এখন পর্যন্ত কিছুটা হলেও এগিয়ে আছেন আব্দুল গফুর।
কুষ্টিয়া-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী জাকির হোসেন সরকার জামায়াতের প্রার্থী আমির হামজার চেয়ে এখন পর্যন্ত এগিয়ে আছেন।
কুষ্টিয়া-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ মেহেদী আহম্মেদ রুমীর চেয়ে জামায়াতের প্রার্থী আফজাল হোসেন এখন পর্যন্ত এগিয়ে আছেন।
ঝিনাইদহ-১ আসনে জামায়াতের আবু ছালেহ মো. মতিউর রহমানের চেয়ে এগিয়ে আছেন বিএনপির প্রার্থী সাবেক অ্যার্টনি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
ঝিনাইদহ-২ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করবেন বিএনপির প্রার্থী আব্দুল মজিদ ও জামায়াতের আলী আজম মো. আবু বকর।
ঝিনাইদহ-৩ আসনে জামায়াতের মো. মতিয়ার রহমান এগিয়ে রয়েছেন। এখানে বিএনপির প্রার্থী মেহেদী হাসান রনি।
ঝিনাইদহ-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির বিদ্রোহী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এগিয়ে আছেন। এই আসনে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পড় ছেড়ে বিএনপি যোগ দেয়া রাশেদ খান বিএনপি প্রার্থী হলেও নেতাকর্মীদের বড় অংশ ফিরোজের পক্ষে। একই দলের দুই প্রার্থীর ভোট ভাগাভাগি হলে জামায়াতের মো. আবু তালিবও শেষ পর্যন্ত সুবিধা পেতে পারেন।
মেহেরপুর-১ আসনে বিএনপি মাসুদ অরুনের সঙ্গে জামায়াতের তাজউদ্দিন খাঁন ভোটযুদ্ধ হলেও দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে মনে করছেন ভোটাররা। তবে, এখন পর্যন্ত মাসুদ অরুন কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন।
মেহেরপুর-২ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের ভোটব্যাংক প্রায় কাছাকাছি। ফলে এই আসনে ভোটের ফলাফল নির্ধারণে ভোটার উপস্থিতি ও শেষ মুহূর্তের নির্বাচনী কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই আসনে জামায়াতের মো. নাজমুল হুদা বিএনপির মো. আমজাদ হোসেন হোসেনের চেয়ে এগিয়ে আছেন। বিএনপির প্রার্থী নিয়েও স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।


