দেশের নদীভাঙন ও হাওরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে আধুনিক শিক্ষা পৌঁছে দিতে ব্র্যাকের ‘অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন তরী’ বহরে যুক্ত হয়েছে নতুন তিনটি তরী। বিজ্ঞান, গণিত ও মূল্যবোধের পর এবার শিশুদের জন্য নিয়ে আসা হয়েছে পরিবেশ, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও ইতিহাসভিত্তিক বিশেষায়িত এই ভাসমান শ্রেণিকক্ষগুলো। নতুন তিনটিসহ প্রতিষ্ঠানটির মোট শিখন তরীর সংখ্যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয়টিতে।
সোমবার নারায়ণগঞ্জের কদম রসুল দরগাহ মাঠে নতুন তিনটি তরীর উদ্বোধন করেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ। তরীগুলোর কার্যক্রম ও শিক্ষাসামগ্রী মূলত প্রাথমিক স্তরের শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়। তবে সব বয়সের শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা এগুলো উপভোগ ও ব্যবহার করতে পারবেন।
ব্র্যাক জানায়, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, দারিদ্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য হাতে-কলমে শেখার সুযোগ তৈরি করতেই এ উদ্যোগ। প্রাথমিক স্তরের শিশুদের উপযোগী করে কার্যক্রম সাজানো হলেও সব বয়সী দর্শনার্থীরা এসব তরী পরিদর্শন করতে পারবেন।
পরিবেশ তরীতে জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য, দূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও টেকসই জীবনধারা সম্পর্কে শিশুদের বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখানো হবে। ডিজিটাল তরীতে থাকবে অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর), ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর), রোবোটিকস ও ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিজিটাল শিক্ষার নানা উপকরণ। আর ইতিহাস তরীতে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, খনন অভিজ্ঞতা, গল্পভিত্তিক প্রদর্শনী ও মানচিত্রভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে।
ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে বন্যাপ্রবণ এলাকায় শিক্ষা কার্যক্রম জোরদারে প্রথম শিক্ষাতরী চালু করা হয়। পরে সেগুলোকে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন তরীতে রূপ দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত ভোলা থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত ১৬ জেলার ৭৭টি স্থানে এসব তরী গেছে। প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষার্থী এই কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে এবং ৪৬২ জন নারী স্বেচ্ছাসেবক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
প্রতিটি এলাকায় শিখন তরী সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিন অবস্থান করে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের প্রবেশ সহজ করতে প্রতিটি তরীতে বিশেষ র্যাম্পের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসিফ সালেহ বলেন, মুখস্থভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ভালো ফল করতে সহায়তা করলেও বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি করতে পারে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের প্রয়োগের সুস্পষ্ট সংযোগের অভাব।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকলেও সমস্যা সমাধানকারীর সংখ্যা খুবই কম। ‘আমি চাই শিক্ষার্থীরা এমন দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক, যারা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে। আগামী দিনের জন্য প্রস্তুত হতে শুধু তথ্য মুখস্থ করলেই হবে না, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে জানতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন তরীর মূল লক্ষ্য হলো শিশুদের এমন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দেওয়া, যার মাধ্যমে তারা বইয়ে পড়া বা সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দেখা বিষয়গুলোকে বাস্তবে উপলব্ধি করতে পারে। এই তরীগুলো সারা দেশে ভ্রমণ করবে এবং শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শেখা, অনুসন্ধান ও বোঝার সুযোগ সৃষ্টি করবে।
অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও অভিবাসন কর্মসূচির পরিচালক সাফি রহমান খান বলেন, শিখন তরীগুলো শুধু শিক্ষার উপকরণ নয়; এগুলো শিশুদের কল্পনার জগৎকে প্রসারিত করে এবং এমন সব অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যেগুলোর সুযোগ তারা অন্যথায় হয়তো কখনোই পেত না।
ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির সামাজিক উদ্যোগ বিভাগের প্রধান নিভিন রেজা বলেন, হাওর ও নদীবেষ্টিত এলাকার শিশুদের জন্য এসব তরী অনেক সময় প্রত্নতত্ত্ব, রোবটিকস, পরিবেশভিত্তিক সিমুলেশন, অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর), ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর), ইন্টারঅ্যাকটিভ গল্প বলা এবং হাতে-কলমে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রথম অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শিবানী সরকার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল কাইয়ুম খান এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আজমল হোসেন। তারা শিখন তরীগুলো পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।


