সরকার গঠনের আগে বিএনপি নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মুক্ত মতপ্রকাশের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল সেটা এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকার ক্রমেই সেই অবস্থান থেকে সরে আসছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার গঠনের দুই মাস না যেতেই বিএনপি আগের অবস্থান থেকে যে অনেকটাই সরে এসেছে ইতোমধ্যেই তার অনেকগুলো প্রমান রেখেছে। সরকারের এমন মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শুধু প্রশ্ন তৈরি হয়নি, হতাশারও জন্ম দিয়েছে।
তবে বিশ্লেষদের কেউ কেউ বলছেন, বিএনপি এখনো পুরোপুরি সরে আসেনি, বরং দলটি নিজের মতো করে সংস্কার করতে চায়। কিন্তু কীভাবে, কতদিনে করবে এবং তা দেশের শাসনব্যবস্থা, রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক চর্চায় জনগনের প্রত্যাশা পুরণ করবে কি না সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে যায়।
বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের যেসব অধ্যাদেশে প্রধানমন্ত্রী ও দলের ক্ষমতা কমবে সেগুলো বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি জ্বালানি ইস্যু বা সরকারের নানা বিষয়ে অনলাইনে সমালোচনা করায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারসহ সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সংস্কার, মুক্তমত চর্চা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে সরকার বা সরকার প্রধানের অবস্থান প্রশ্নের মুখোমুখি।
যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে, জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কার করা হবে। এ ছাড়া বিএনপি নির্বাচনের আগে প্রশাসনের নানা ক্ষেত্রে দলীয়করণ না করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বর্তমান বাস্তব অবস্থা তার বিপরীত, বরং সরকারে এসে তারা সর্বত্র দলীয়করণ শুরু করেছে।
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর ভালো ভালো কথা বলা, সাদামাটা চলাফেরা ও জনসম্পৃক্ত নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন প্রশংসিত হলেও অন্যসব ক্ষেত্রে তার ছাপ দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে সন্দেহ ও প্রশ্ন উঠছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীর মতে, স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো, দুদকের স্বাধীনতা বাড়ানোসহ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর যে প্রতিশ্রুতি বিএনপি দিয়েছিল তারা এখন সেখান থেকে সরে এসেছে। কার্যত দলটি ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে নিজেদের মতো করে সংস্কার করতে চাইছে।
তিনি বলেন, আগে আওয়ামী লীগ যে কাজ করেছে বিএনপিও এখন একই পথে হাঁটছে। যেখানে তাদের ক্ষমতা বাড়বে সেটি বাস্তবায়ন করছে। আর যেগুলোতে ক্ষমতা কমবে সেগুলো বাস্তবায়ন না করার স্পষ্ট অবস্থান দেখা যাচ্ছে। কেন তারা হঠাৎ করে অবস্থান পরিবর্তন করছে, সেটি খুঁজে বের করা দরকার।
সরকারের সমালোচনা করায় ভোলায় এক নারীকে গ্রেপ্তার মুক্ত মত ও আইনের শাসন বাধাগ্রস্ত হয়েছে তিনি উল্লেখ করেন।
দিলারা চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলেও সজ্জন ও উচ্চ শিক্ষিত পরিছন্ন মানুষ হিসেবে পরিচিত সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিনকে হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তারের পর রিমান্ড চাওয়া কতটুকু যুক্তিসংগত তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
সংস্কার নিয়ে খোদ বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী ও দলটির নেতাদের মধ্যেও অসন্তোষ আছে। অনেকে সরকারের বর্তমান অবস্থানে যে সন্তুষ্ট নন, তা তাদের বক্তব্যে বোঝা যায়।
গত শনিবার রাজধানীর বনানীতে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু সংস্কার প্রশ্নে বলেন, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন না এলে জেনজি আবারও গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে পারে।
দলটির একজন ভাইস চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রকৃত সংস্কার না করা দুঃখজনক। এর জন্যে আমাদের আগামীতে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।’
ইতোমধ্যে বিরোধী দলগুলো সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক কর্মসূচি শুরু করেছে। সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ও বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে তারা সরকারকে দ্রুত কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়নের আহ্বান জানাচ্ছে।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনা করে সরকারের ক্ষমতা বাড়ানো প্রস্তাবগুলো আইনে রূপান্তরের সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। তবে সরকারের জবাবদিহি বাড়ায় এমন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল বা আপাতত স্থগিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
আইনে রূপ পাচ্ছে এমন অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অপসারণ, সরকারি কর্মচারীদের দ্রুত বরখাস্ত এবং ওয়াসা কর্মচারীদের অপসারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে রাখা।
অন্যদিকে, বিচারপতি নিয়োগে স্বাধীন কাউন্সিল ব্যবস্থা, গুম প্রতিরোধ আইন, মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি ও দুদকের স্বাধীনতা বাড়ানোর মতো প্রস্তাবগুলো আইনে রূপ পাচ্ছে না। এতে বিভিন্ন মহল থেকে সরকারের জবাবদিহি কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সরকারের প্রশাসনিক ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে। তবে জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক বা প্রশ্ন তৈরি হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বি আলী মনে করেন, বিএনপি পুরোপুরি সংস্কার থেকে সরে যায়নি। তবে যেসব সংস্কার তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক, সেগুলোতে আগ্রহ থাকলেও নির্বাহী ক্ষমতা কমবে এমন বিষয়ে দ্বিধা দেখা যাচ্ছে। তাই জনচাপ, সংসদীয় নজরদারি ও নাগরিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে কতটা কার্যকর সংস্কার সম্ভব সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা দুর্বল হলে দেশ ফের পেছনে পড়বে। তাই সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত দলীয় প্রভাব কমানো এবং কার্যকর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।
আসিফ বিন আলী বলেন, শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেপ্তারকে আইনি গুরুত্বের পাশাপাশি সতর্কভাবে দেখা দরকার। উচ্চ পদে থাকা মানেই ব্যক্তিগত অপরাধ প্রমাণিত হয় না। বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে তা আদালতে যাচাই হওয়া উচিত। অন্যথায় প্রমাণের আগে গ্রেপ্তার হলে তা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে নিজেকে নিয়ে পত্রিকায় ছাপা কার্টুন ফেসবুকে দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা মুক্ত মত চাই।’ অথচ তার সরকারের সমালোচনায় গ্রেপ্তার ঘটনা বিপরীত অবস্থানের জন্ম দিয়েছে।
শুধু তারেক রহমান নয়, বিএনপি নেতারা ভোটের আগে বেশিরভাগ নির্বাচনী জনসভায় দেশের আইনের শাসন, সংস্কার বাস্তবায়ন, মুক্তমত চর্চার পরিবেশ তৈরি করার প্রতিশ্রুত দিয়েছিলেন। তাদের অনেকেই এখন, সংস্কারের ব্যাখাও নিজেদের মতো করে দিচ্ছেন। যা নিয়ে সভা-সেমিনার ও টকশোতে সমালোচনা ঝড় বাড়ছে।
বিএনপি সরকার গঠনের পর পরই দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিতির সদস্য ও গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মুস্তাকুর রহমানকে গভর্নর নিয়োগ দেয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে মব সৃষ্টি করে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও জনসাধারণের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল।
সরকার গঠনের পর বিএনপি দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রেও একেবারেই দলীয় লোক বসিয়েছে। অথচ দলটির প্রতিশ্রুতি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কমিটি ভেঙে দিয়ে যে অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে, সেখানে তিন মন্ত্রীর ছেলে ও এক প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রীকে সদস্য করায় সমালোচনার ঝড়ে উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ‘দলীয়করণের ক্ষেত্রে সরকার আগের পথেই হাঁটছে যা পরিবর্তনের নামে প্রতারণা।’ গার্মেন্টসের এমডিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ সম্পর্কেও সরকারের অবস্থান নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
সর্বশেষ বুধবার জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল-২০২৬ পাস হয়েছে। এর ফলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থাকছে। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার আরেকটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করল।
নির্বাচনের আগে তারা বার বার বলেছিল বিএনপি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে না। অথচ তড়িঘড়ি করে বিল পাস করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এটা করে আওয়ামী লীগের পথই বেছে নিয়েছে বিএনপি। একই আইন ব্যবহার করে ক্ষমতায় থাকাকালে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিল আওয়ামী লীগ।


