বিএনপি সরকার ব্যাংক খাতের লুটেরাদেরকে আবার ফিরিয়ে আনতে চায় বলে অভিযোগ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)। রোববার রাজধানীতে ‘জ্বালানি, অর্থনীত, সংস্কার ও গণভোট’ বিষয়ে জাতীয় কনভেনশনে এই অভিযোগ করা হয়।
বক্তারা বলেন, আওয়ামী লীগ শাসনামলে ব্যাংক খাতে লুটপাট, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার বিশৃঙ্খলা এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে অলিগার্কিক অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এতে দেশের অর্থনৈতিক সুশাসন ভেঙে পড়ে।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্সের অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশকে বিএনপি সরকার বিতর্কিতভাবে আইনে রূপান্তরিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্যকে সরকার বদলে দিয়েছে। লুটেরা-মাফিয়াদের আবারো ফিরিয়ে আনার পাঁয়তারা চলছে।’
সাড়ে ৭ শতাংশ ঋণ শোধ করলেই ব্যাংকগুলোকে আগের মালিকের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘অথচ এর আগে যে মালিকদের কাছ থেকে কৌশলে ও চাপের মুখে মালিকানা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল-তাদের বিষয়ে কিছু বলা হলো না। এমনকি যারা আগে বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত, তাদেরও অযোগ্য করা হয়নি আইনে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ব্যাংক রেজ্যলুশন আইনে ১৮(ক) ধারা সংযুক্ত করে বিল পাস হয়। এর মাধ্যমে একীভূত হওয়া পাঁচ শরিয়াহ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে পুরোনো মালিকরা ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল বিতর্কিত ব্যবসায়ীগোষ্ঠী এস আলম ও নাসার কাছে।
অন্তবর্তী সরকারের আমলে অর্থনৈতিক সংস্কারের অভাব ছিল বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতির থিংক ট্যাংক ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের’ চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে জ্বালানি ও ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। এখন লুট বন্ধ আছে। তবে অর্থনীতির অবস্থা ভঙ্গুর। গত ৯ মাসে ৯৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। গত দুই দশক এই খাতে সরকার কিছুই করেনি। শূন্য থেকে রাজস্ব খাত সংস্কার করতে হবে। এমনকি রাষ্ট্রের ঋণ ব্যবস্থাপনাও নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে।’
অতিমাত্রায় বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতা রাষ্ট্রের আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে দিয়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এখন দেশের অর্থনীতির যে অবস্থা-তাতে রপ্তানি থেকে যে আয় হবে, তার প্রায় সমান বৈদেশিক ঋণ শোধ করতেই চলে যাবে।’
বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনকে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বলে বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘আমরা একটা প্রতারণামূলক দলের সঙ্গে কাজ করছি। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের যে পরিকল্পনা ছিল, তা মেটিকুলাস ডিজাইন করে ধ্বংস করা হয়েছে।’
‘১৯৯১ সালে তিনটি রাজনৈতিক দল মিলে যেসব বিষয়ে একমত হয়েছিল, মানুষকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, বিএনপি ক্ষমতায় এসে তার একটিও বাস্তবায়ন করেনি। ২০০১ সালেও তারা দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি নিয়ে এসেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ম্যানিপুলেট করেছিল তারা। শেখ হাসিনাও দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি নিয়ে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেনৈ। এখনো সেই লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি,’ যোগ করেন তিনি।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) উপদেষ্টা মির্জা এম হাসান বলেন, ‘অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে সরকার ব্যাড গভর্ন্যান্স এর দিকে ধাবিত হচ্ছে। এসব দেখে শেখ হাসিনাও ভিড়মি খাচ্ছেন।’
কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিডিজবস ডট কমের সিইও ফাহিম মাসরুর বলেন, ‘শিক্ষিত তরুণদের অর্ধেকই বেকার। এটা সামাজিক সমস্যা থেকে রাজনৈতিক সমস্যায় রূপান্তরিত হয়েছিল। একারণেই কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল। কিন্তু এখনো এই বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
আমলারা অনেকে বিভিন্ন বেসরকারি জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজ করেন করেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট হিসেবে তারা সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। পরে অবসরে গিয়ে সেসব প্রতিষ্ঠানের কোনো একটা পদে চাকরি করেন।’
আমদানি নির্ভরতা থেকে বের হয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সক্ষমতা অর্জন করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানও জানান হাসনাত।
বিএনপি সরকার আর সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চায় না বলে অভিযোগ করেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। বলেন, ‘গণভোট হওয়ার পর বিএনপি কোন বিষয়ে রাজি, কোন বিষয়ে নিমরাজি, কোন বিষয়ে রাজি না-তা আর মুখ্য বিষয় হতে পারে না। জনগণ গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। এখন তা না মানার জন্য অজুহাত খুঁজলে জনরায়কে প্রত্যাখ্যান করা হয়।’
দলটির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, ‘স্থানীয় সরকারের বিষয়ে যে আইন করা হয়েছে তা ব্যবহার করে কাউকে অপছন্দ হলেই তাকে সরিয়ে দিয়ে পছন্দমতো প্রশাসক বসানো যাবে। কিন্তু যেসব বিষয় জরুরি ছিল-পুলিশ কমিশন, গুম কমিশন, পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, সংবিধান সংস্কার-এসব বিষয় থেকে বিএনপি সরে গেছে।’


