বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত কার্বননির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় কাঠামোগতভাবে আটকে আছে। বিদ্যমান প্রযুক্তিতে মূলধন ও জ্বালানি পরস্পরের বিকল্প না হয়ে পরিপূরক হিসেবে কাজ করায় শুধু নতুন যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করলেই জ্বালানি ব্যবহার কমানো সম্ভব হচ্ছে না।
একই সঙ্গে ছোট কারখানায় জ্বালানি দক্ষতার বড় ঘাটতি এবং ওয়াশিং-ডাইংয়ে উচ্চ জ্বালানি ব্যবহারের কারণে কার্বন নিঃসরণ কমানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নতুন এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। রোববার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘শিল্প কার্বনমুক্তকরণ: কীভাবে একে এগিয়ে নেওয়া যায়’ শীর্ষক সংলাপে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। দেশের ৩৫০টি পোশাক কারখানার তথ্য ও জ্বালানি ব্যবহারের ওপর গবেষণাটি করা হয়েছে।
গবেষণা প্রবন্ধটি উপস্থাপন করে সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট সামি মোহাম্মদ।
গবেষণায় দেখা যায়, পোশাক কারখানার ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির প্রায় ৮৫ শতাংশই সেলাই বিভাগের। তবে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি-নিবিড় উৎপাদন ধাপ ওয়াশিং ও ডাইং। এ বিভাগে প্রতি ইউনিট উৎপাদনে জ্বালানি ব্যবহার পরবর্তী সর্বোচ্চ বিভাগের প্রায় দ্বিগুণ। ফলে যন্ত্রপাতির সংখ্যা কম হলেও এই ধাপটি কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।
সিপিডির গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সেলাই বিভাগের সিঙ্গেল নিডল লকস্টিচ, ওভারলক, ফ্ল্যাটলক, বারট্যাক, বাটনহোল ও বাটন-সেলাই মেশিনের মতো কিছু যন্ত্র উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় অপরিহার্য। এসব যন্ত্রের কার্যকর বিকল্প না থাকায় শুধু যন্ত্র প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে সেলাই বিভাগে বড় ধরনের জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব নয়, বরং কাটিং বিভাগে তুলনামূলক কম যন্ত্র থাকলেও বিকল্প যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে সাশ্রয়ের সুযোগ বেশি।
কারখানার আকারভেদেও জ্বালানি দক্ষতায় বড় পার্থক্য রয়েছে। ছোট কারখানাগুলোতে দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে, যেখানে বড় কারখানায় এ সম্ভাবনা প্রায় ৯ শতাংশ। তবে মোট সাশ্রয়ের পরিমাণ বড় কারখানায় বেশি হবে। কারণ, তাদের উৎপাদনের পরিমাণও বেশি।
গবেষণা অনুযায়ী, উপযুক্ত যন্ত্র প্রতিস্থাপন করা গেলে গড়ে একটি কারখানায় ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। তবে এ পরিবর্তন বাস্তবায়নে প্রায় ৬৬ থেকে ১৩২ বিলিয়ন টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। এর বড় অংশই ব্যয় হবে বৃহৎ কারখানাগুলোতে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও এখনো সীমিত। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে কারখানার গ্রিড ও ক্যাপটিভ বিদ্যুতের ব্যবহার কিছুটা কমানো সম্ভব হলেও গ্যাসচালিত বয়লারের বিকল্প হিসেবে এটি এখনো কার্যকর নয়। ফলে ওয়াশিং ও ডাইংয়ের মতো তাপনির্ভর প্রক্রিয়ায় কার্বন কমানোর বড় ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
সিপিডি বলছে, উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ, দক্ষ প্রযুক্তি ও এর সম্ভাব্য সাশ্রয় সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি এবং দীর্ঘ পে-ব্যাক পিরিয়ডের কারণে উদ্যোক্তাদের অনেকে নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে আগ্রহী নন। এ ক্ষেত্রে ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স ও বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো হলে শুধু খরচ কমানো নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি দামের ওঠানামার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব। তবে কার্বনমুক্ত উৎপাদনে যেতে হলে দক্ষ যন্ত্রপাতি, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, তাপীয় প্রক্রিয়ার বিকল্প প্রযুক্তি ও সবুজ অর্থায়ন–সবগুলো ক্ষেত্রেই একসঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে।
সংলাপে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, গ্যাসের মজুত কমে আসায় এলএনজিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিকল্প প্রযুক্তিতে যেতে হবে।


