ব্যাংকিংয়ে আস্থা ফেরাতে স্বচ্ছতার বিকল্প নেই

ব্যাংকিংয়ে আস্থা ফেরাতে স্বচ্ছতার বিকল্প নেই
এসবিএসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. মোখলেসুর রহমান।
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে শুধু প্রবৃদ্ধি বা ব্যবসায়িক বিস্তার মূল লক্ষ্য নয়। বছরের পর বছর সুশাসনের অভাব, ঋণ কেলেঙ্কারি আর শৃঙ্খলার অভাবে থাকা এ খাতের এখন আসল পরীক্ষা হলো বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনমানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

সম্প্রতি টাইমস অব বাংলাদেশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. মোখলেসুর রহমান এমন মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তার মতে, দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান নড়বড়ে অবস্থায় টিকে থাকতে হলে স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই।

চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে ১৩ বছর পূর্ণ করা এসবিএসি ব্যাংক এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই তাদের কৌশল সাজিয়েছে। ব্যাংকটি এখন আগ্রাসীভাবে শাখা না বাড়িয়ে বরং কমপ্লায়েন্স (পরিপালন), শক্তিশালী তারল্য ও নিরবচ্ছিন্ন গ্রাহকসেবার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। মোখলেসুর রহমান বলেন, আস্থাহীনতার এই বাজারে এসবিএসি ব্যাংকের এই রক্ষণশীল কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক অবস্থানই তাদের অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।

এসবিএসি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের মতে, গত ১৩ বছরে তাদের বড় অর্জন হলো সব ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক নির্দেশক বা কমপ্লায়েন্স মেনে চলা। তিনি মনে করেন, বর্তমান বাজারে নিয়মনীতি মেনে চলা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি ব্যবসায়িক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের বড় হাতিয়ার। কারণ, এর মাধ্যমেই গ্রাহকের মনে নির্ভরতা তৈরি হয়।

ব্যাংকটির আর্থিক চিত্রেও সেই আস্থার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। মোখলেসুর রহমান জানান, অন্যান্য ব্যাংক থেকে নতুন গ্রাহকরা যেমন আসছেন, তেমনি পুরনো গ্রাহকরাও নিশ্চিন্তে লেনদেন করছেন। ব্যাংকটির অগ্রিম-আমানত অনুপাত (এডিআর) বর্তমানে ৮২ শতাংশের কাছাকাছি এবং উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি। ৩১ মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকটিতে আমানতের পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত তারল্য থাকার অর্থ হলো যে কোনো সময় গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা, যা আমানতকারীদের মধ্যে স্বস্তি দেয়।

প্রতিষ্ঠানের এই স্থিতিশীলতার পেছনে কর্মীদের বড় ভূমিকা দেখছেন চেয়ারম্যান। তিনি জানান, কর্মীদের প্রতিযোগিতামূলক বেতন, পেশাগত উৎকর্ষ এবং কাজের সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা এসবিএসি ব্যাংকের অন্যতম অগ্রাধিকার।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকটি এখন দেশের শীর্ষ ১০টি ব্যাংকের তালিকায় জায়গা করে নিতে চায়। এ লক্ষ্য অর্জনে উদ্ভাবনী সেবা, প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার এবং উচ্চতর করপোরেট সুশাসন বজায় রাখা হবে। বিশেষ করে, পরিচালনা পর্ষদের হস্তক্ষেপ ছাড়াই পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালনার ওপর তিনি জোর দেন।

আরও পড়ুন

সাক্ষাৎকারে দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত নিয়ে মোখলেসুর রহমান বলেন, এখন সংস্কারের ঘোষণার চেয়ে সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ জরুরি। নীতিমালার ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমান সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে শৃঙ্খলা ফেরানোর এটি একটি বড় সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

ব্যাংকিং খাতের জন্য তিনি তিনটি প্রধান ঝুঁকি চিহ্নিত করেছেন: ১. আস্থার সংকট। ২. খেলাপি ঋণ বা সম্পদের দুর্বল গুণমান। ৩. বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম, ডলারের সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা।

তিনি মনে করেন, আস্থার সংকট বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের আচরণকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে বৈশ্বিক চাপ আমদানি খরচ বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

মোখলেসুর রহমান কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কেবল নীতিনির্ধারক নয়, বরং একটি ‘স্থিতিশীল নোঙর’ হিসেবে দেখতে চান। তিনি মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত স্পষ্ট যোগাযোগ ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর অভিভাবক হিসেবে কাজ করা।

মুদ্রানীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আর প্রবৃদ্ধি—এ দুটিকে মুখোমুখি দাঁড় করানো ঠিক হবে না। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য দামের স্থিতিশীলতা জরুরি, তবে কেবল সুদহার বাড়িয়ে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা সম্ভব নয়। ব্যবসার জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এর ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে বাধা এলে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে হাত গুটিয়ে বসে না থেকে আগেভাগেই ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে তার অবস্থান কঠোর। তিনি বলেন, ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আবেগের কোনো স্থান নেই; প্রয়োজন শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের জবাবদিহির আওতায় আনা। অনেক উদ্যোক্তা নগদ প্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো) বিচার না করেই ব্যবসা শুরু করেন বা ঋণের টাকা অন্য খাতে সরিয়ে নেন, যা খেলাপি হওয়ার অন্যতম কারণ। এ কারণে এসবিএসি ব্যাংক ঋণের ব্যবহারের ওপর কড়া নজরদারি রাখছে।

মোখলেসুর রহমান পরিশেষে বলেন, সুশাসন নিশ্চিত করা, কঠোরভাবে আইন কার্যকর করা এবং সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত হারানো বিশ্বাস ফিরে পেতে পারে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad