উদীয়মান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, কেবল প্রবৃদ্ধির দিকে না গিয়ে সরকার একটি টেকসই, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
শুক্রবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিন সকালে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা স্থাপনের চেষ্টা করছি; নানামুখী চাপ মোকাবিলা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজে হাত দিয়েছি। নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটে জনগণের যে বিপুল প্রত্যাশা, সে সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ সচেতন।’
‘বিগত ১৬ বছরে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের কারণে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাত অকার্যকর হয়ে পড়েছে’, যোগ করেন আমীর খসরু।
তিনি জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছর, ২০২৩-২৪ অর্থবছর এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক তুলনা করে দেখা গেছে, অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পেলেও এর ভেতরে কাঠামোগত দুর্বলতা আরও প্রকট হয়েছে।
২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৫১ শতাংশে এবং কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৩০ শতাংশে নেমেছে।
‘শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকায় তরুণরা কৃষিতে ঝুঁকছে, যা ছদ্ম বেকারত্ব বাড়াচ্ছে এবং উৎপাদনশীলতা কমাচ্ছে’ বলেও মনে করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে মোট কর্মসংস্থানের ৪১ শতাংশ কৃষি খাতে থাকলেও জাতীয় আয়ে এর অবদান মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, যা শ্রমের নিম্ন উৎপাদনশীলতা এবং কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি নির্দেশ করে। সেই সঙ্গে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ভারসাম্যও নষ্ট হয়েছে।
বক্তব্যে আমীর খসরু জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয় ছিল ২৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান ২০০৫-০৬ সালে ছিল ৬৭ দশমিক ২ টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ১২১ টাকায় পৌঁছেছে।
মুদ্রা সরবরাহ ও রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি কমে গেছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। এটি ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও বিনিয়োগ মন্থরতার প্রতিফলন।
রাজস্ব আদায়ে অগ্রগতি না হওয়া এবং ফাঁকি ও অপচয়ের কারণে সরকারের সম্পদ আহরণ সক্ষমতা সীমিত হয়েছে বলে মনে করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাজেট ঘাটতি ২০০৫-০৬ সালের ২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ০৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিগত সময়ে বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্পগুলো অতিমূল্যায়িত ছিল এবং যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া বাস্তবায়নের কারণে সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত সুফল পায়নি।
এসব প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সুদ পরিশোধে ব্যয় ছিল ৮৫ বিলিয়ন টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৩ গুণেরও বেশি বেড়ে ১১৪৭ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে।
অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বেসরকারি খাত, বিশেষ করে এসএমই খাতের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০৫-০৬ সালে রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও ২০২৩-২৪ সালে তা নেতিবাচক হয়েছে।
অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, হুন্ডি ও অর্থ পাচারের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।


