অর্থ পাচার তদন্ত: স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সিইওকে দুদকের কড়া চিঠি

অর্থ পাচার তদন্ত: স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সিইওকে দুদকের কড়া চিঠি
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও দুদকের লোগো
Advertisement
Advertisement

অর্থ পাচারের অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সহযোগিতা করছে না বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (এসসিবি)। দুইবার চিঠি দিয়েও নথি না পাওয়ায় এসসিবি’র কাছে কড়া ভাষায় তাগিদপত্র পাঠিয়েছে দুদক। গত ২৯ জানুয়ারির এই পত্রে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা না করলে তিন বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধানের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এস এন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন ও শেল কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এই নথিগুলো চাওয়া হয়েছিল ।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর প্রথম দফায় গত ৪ ডিসেম্বর চিঠি দিয়ে এসসিবি’র কাছে শওকত আলী চৌধুরীর নামে পরিচালিত সব হিসাবের বিবরণী, হিসাব খোলার ফর্ম, গ্রাহক পরিচিতিসংক্রান্ত তথ্য (কেওয়াইসি), অভ্যন্তরীণ অনুমোদন নথি এবং দেশি ও বিদেশি লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব তথ্য পাওয়া যায়নি ।

পরবর্তীতে ১১ জানুয়ারি দুদক স্মারক চিঠি পাঠিয়ে অনুসন্ধানের পরিধি আরও বিস্তৃত করে। ওই চিঠিতে শওকত আলী চৌধুরীর স্ত্রী তাসমিয়া আম্বারীন, সন্তান যারা নামরীন ও মো. জারান আলী চৌধুরী এবং নিকটাত্মীয়দের নামে থাকা হিসাব, পারিবারিক সদস্যদের মাধ্যমে পরিচালিত লেনদেন, সংশ্লিষ্ট দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব এবং এসব ক্ষেত্রে যথাযথ বর্ধিত যাচাই করা হয়েছে কি না, সে-সংক্রান্ত নথিও চাওয়া হয় ।

দুদকের মতে, পরিবারভিত্তিক আর্থিক নেটওয়ার্ক মানিলন্ডারিং বা অবৈধ সম্পদ আড়ালের ক্ষেত্রে বড় ঢাল হতে পারে।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, দ্বিতীয় দফার চিঠির পরও এসসিবি প্রয়োজনীয় সব নথি সরবরাহ করেনি। এতে অনুসন্ধান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় দুদক সর্বশেষ একটি তাগিদপত্র পাঠাতে বাধ্য হয়। ওই পত্রে দুদক স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী কমিশনের নির্দেশ অমান্য করা বা তথ্য প্রদানে বাধা দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ক্ষেত্রে অনুর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে – এই বিষয়টি পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে ।

দুদক কর্মকর্তাদের ধারণা, শওকত আলীর আর্থ পাচারের ঘটনায় নথি পাঠাতে এসসিবি ইচ্ছাকৃতভাবে গাফিলতি বা সময়ক্ষেপণ করছে। একজন তদন্ত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইউ) একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদনে শওকত আলীর অর্থ পাচারের পেছনে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গাফিলতির বিষয়টি উঠে এসেছে।’

বিএফআইইউ’র ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শওকত আলী চৌধুরী ও তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত একাধিক বৈদেশিক লেনদেনে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বর্ধিত যাচাই যথাযথভাবে সম্পন্ন করেনি। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে এটি বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেনে গ্রাহকের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস ও লেনদেনের উদ্দেশ্য বিস্তারিতভাবে যাচাইয়ের ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাটি।

আরও পড়ুন

তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে যে নথিগুলো চাওয়া হয়েছে সেগুলো সরবরাহ করা হলে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের অর্থ পাচারে সহযোগিতা বা পাচার রোধে গাফিলতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে আসতে পারে। এ কারণেই নথি দিতে দেরি হচ্ছে কি না – সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে দুদক।

দুদককে অসহযোগিতার বিষয়ে জানতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসের এজাজ বিজয়কে একাধিকবার ফোন ও ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি উত্তর দেননি। উল্টো কল কেটে দেন তিনি এবং এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আর যোগাযোগ করেননি।

এদিকে দুদক সূত্র জানিয়েছে, তাগিদপত্রে আগামী ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সব নথি সরবরাহ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি সরবরাহ না করলে এসসিবি’র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে ।

এ বিষয়ে দুদকের উপপরিচালক ও অনুসন্ধান টিমের প্রধান মো. মুস্তাফিজুর রহমান ‘টাইমস’কে জানান, এসসিবি’র কাছ থেকে আনুসঙ্গিক সব নথি সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দুদক।

দুদকের পত্রে শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে উত্থাপন করা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে তার ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া এলসির মাধ্যমে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানির নামে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে শেল কোম্পানি দেখিয়ে বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়গুলো সংস্থাটির তদন্তে রয়েছে।

দুদকের তদন্তে শওকতের নতুন সিন্ডিকেটের তথ্য

এদিকে অনুসন্ধানে নেমে দুদকের কর্মকর্তারা শওকত আলী চৌধুরীর বিষয়ে আরও কিছু চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত ব্যবসায়ী চৌধুরী নাফিজ শারাফাত এবং তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতের সঙ্গে শওকত আলীর একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে সংস্থাটি।

তদন্ত কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৩ মার্চ ইস্টার্ন ব্যাংকের বোর্ড সভায় নাফিজ শারাফাতের প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজিক ফাইন্যান্সের ঋণের শর্ত শিথিল করা হয়। ঠিক একই সময়ে সিডনেট কমিউনিকেশনসের ৩ লাখ শেয়ার শওকত আলীর একটি প্রতিষ্ঠানের নামে হস্তান্তর করা হয়। সিডনেটে আরাফাত ও তার স্ত্রী শেয়ারহোল্ডার ছিলেন।

এদিকে ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে নাফিজ শারাফাতের প্রতিষ্ঠান ফ্রন্টিয়ার টাওয়ার্স বাংলাদেশকে ২২০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামোর সঙ্গে গোপনে যুক্ত ছিলেন শওকত আলী ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন জেড এন এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড।

উল্লেখ্য, শওকত আলী চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad