দেশের আমের রাজধানীখ্যাত রাজশাহী অঞ্চলে চলতি মৌসুমেও আমের সন্তোষজনক দাম না পেয়ে হতাশ কৃষক, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বাজারমূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন ভালো হলেও তারা এর সুফল পাচ্ছেন না। বরং বাগান পরিচর্যা, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে থাকলেও আমের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি।
রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, পুঠিয়া, তানোর, মোহনপুর ও গোদাগাড়ীসহ আম উৎপাদনকারী বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌসুমের শুরু থেকেই বাজারে আমের দাম নিয়ে অসন্তোষ বিরাজ করছে। বিশেষ করে গোপালভোগ, লক্ষণভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া ও আম্রপালিসহ জনপ্রিয় জাতের আমের দাম গত কয়েক বছরের তুলনায় খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয় বলে দাবি চাষিদের।
আম চাষিরা জানান, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় অনেক এলাকায় আমের উৎপাদন ভাল হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহও বেড়েছে। সাধারণ অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে দাম কিছুটা কমে। তবে শুধু বেশি উৎপাদনই আমের দাম কমার একমাত্র কারণ নয় বলে জানান চাষিরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো পণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাত করার সক্ষমতা না বাড়লে উৎপাদন বৃদ্ধি সমস্যায় পরিণত হয়। রাজশাহীতে আম চাষের মূল সংকট এখানেই।
আম একটি দ্রুত পচনশীল ফল। পর্যাপ্ত হিমাগার ও আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় কৃষক ও বাগান মালিকরা দীর্ঘদিন আম ধরে রাখতে পারেন না। ফলে বাজারে দাম কম থাকলেও তারা দ্রুত আম বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে পাইকার ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা পেলেও উৎপাদক পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয় না।
বাঘা উপজেলার এক বাগান মালিক জানান, একটি বাগান পরিচর্যায় আগের তুলনায় ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু আম বিক্রির সময় সেই খরচের প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে আম বেশি আসার সুযোগে অনেক ক্রেতা কম দাম বলছেন।
আম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বলছেন, বাগান থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। কৃষকের কাছ থেকে কম দামে আম কিনে মধ্যস্বত্বভোগীরা বেশি মুনাফা করলেও উৎপাদকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। সরাসরি কৃষক থেকে ভোক্তার কাছে আম পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা এখনও সীমিত।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা না থাকায় অনেক সময় চাষিরা অসহায় অবস্থায় কম দামে আম বিক্রি করতে বাধ্য হন।
রাজশাহীর আম দেশজুড়ে জনপ্রিয় হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির পরিমাণ এখনও প্রত্যাশার তুলনায় কম। উৎপাদন বাড়লেও নতুন বাজার সৃষ্টি না হওয়ায় অধিকাংশ আম স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সরবরাহ বেড়ে গেলে দামের ওপর চাপ পড়ে।
এছাড়া আমভিত্তিক শিল্প যেমন জুস, পাল্প, আচার, শুকনো আম ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যের শিল্প এখনো পর্যাপ্তভাবে বিকশিত হয়নি। ফলে অতিরিক্ত উৎপাদিত আমের বড় অংশ তাজা ফল হিসেবেই বাজারে আসে, এতে আমের দামও কমে যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থার অভাবও আমের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রাজধানী ও অন্যান্য বড় শহরে সহজে আম পৌঁছাতে না পারলে উৎপাদনকারী এলাকাগুলোতেই সরবরাহের চাপ সৃষ্টি হয়। এতে স্থানীয় বাজারে দরপতন ঘটে।
বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া এলাকার ব্যবসায়ী ও বাগান মালিক শফিকুল ইসলাম ছানা বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে চলতি মৌসুমে আমের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন ভালো হলেও আমের বাজারদর নিয়ে বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। সরকারিভাবে আমের বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার, আধুনিক প্রসেসিং সেন্টার স্থাপন এবং রপ্তানি কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষক, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা আম থেকে অধিক লাভবান হতে পারবেন।
বানিয়াপাড়া গ্রামের আম ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক বলেন, ঈদের ছুটির পর একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ আম বাজারে আসায় সরবরাহ বেড়ে গেছে। এতে বাজারে আমের দামে ধস নেমেছে। এছাড়া অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আড়ৎদার ও পাইকারদের উপস্থিতিও তুলনামূলক কম। ফলে বিক্রি যেমন কম হচ্ছে, তেমনি কাঙ্ক্ষিত দামও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন।
একই এলাকার বাগান মালিক শহিদুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে বাগান পরিচর্যা, সার, কীটনাশক, সেচ এবং শ্রমিকের মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর সঙ্গে আম সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় আমের বাজারমূল্য বাড়েনি। ফলে উৎপাদন খরচ উঠবে কি না, তা নিয়েই শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেকেরই পুঁজি হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আম বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও লেখক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে চলতি মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে আমের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহও বেড়েছে, যা আমের দাম কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, ঈদের আগে আমের বাজার মোটামুটি ভাল ছিল। তবে ঈদের পর দাম কিছুটা কমে যায়। একই সময়ে লিচুরও বাম্পার ফলন হওয়ায় ভোক্তাদের একটি বড় অংশের আগ্রহ লিচুর দিকে ঝুঁকেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমের চাহিদা কিছুটা কমে গেছে।
তিনি আরও বলেন, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত আম অনেক ক্ষেত্রে ‘রাজশাহীর আম’ পরিচয়ে দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। সাধারণ ক্রেতারা অনেক সময় বুঝতে পারেন না কোনটি প্রকৃত রাজশাহীর আম আর কোনটি অন্য জেলার। পাশাপাশি কিছু ব্যবসায়ী অপরিপক্ব আম আগেভাগেই বাজারজাত করছেন, যা রাজশাহীর আমের সুনাম ও ঐতিহ্যের জন্য ক্ষতিকর। এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে রাজশাহীর আমের স্বকীয়তা ও ব্র্যান্ড মূল্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতিতে আম একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হলেও উৎপাদক পর্যায়ে লাভ কমে গেলে ভবিষ্যতে অনেক কৃষক আমচাষে আগ্রহ হারাতে পারেন। এটি দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক হতে পারে।
তাদের মতে শুধুমাত্র উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, উৎপাদিত আমের সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য প্রয়োজন আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ, প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা, অনলাইন বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহের কার্যকর উদ্যোগ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমচাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার, কৃষি বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, কৃষক পর্যায়ে বাজার তথ্য পৌঁছে দেওয়া, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং আমভিত্তিক শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
রাজশাহীর আম দেশের গর্ব। কিন্তু উৎপাদকরা যদি বছরের পর বছর ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে এই সম্ভাবনাময় খাতের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কৃষক, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা।


