বেনজীর ও তার পরিবারের নজিরবিহীন সম্পদ

বেনজীর ও তার পরিবারের নজিরবিহীন সম্পদ
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ চাকরি জীবনে ছিলেন আলোচিত ও সমালোচিত। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার থাকাকালীন তার বেপরোয়া আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

গোপালগঞ্জের বাসিন্দা হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তিনি ছিলেন প্রভাবশালী। সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। পরে তিনি এলিট ফোর্স র‍্যাবের মহাপরিচালক হলে ক্রসফায়ার ও গুমের নেপথ্যে তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ওঠে। সেখান থেকে পরে তাকে পুলিশ মহাপরিদর্শক করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে বেনজীরের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি তার জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

সম্পদের তথ্য

দুদকের অনুসন্ধানে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের মোট ৪৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩৩৪ বিঘা (প্রায় ১১৪ একর) জমি, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং ২৩টি কোম্পানিতে শেয়ারসহ বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়।

দুদক ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, সাভার, মাদারীপুরের রাজৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় স্ত্রী জিশান মির্জার নামে সবচেয়ে বড় অংশসহ মোট ৩৪৫ বিঘা জমি রয়েছে। মানিকগঞ্জের সিংগাইরেও তার স্ত্রীর নামে সম্পত্তি ছিল।

বিভিন্ন কোম্পানিতে পরিবারের নামে আটটি পূর্ণাঙ্গ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং ১৫টি আংশিক মালিকানার শেয়ার রয়েছে। ঢাকার গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, সাভানা ইকো রিসোর্ট ও ন্যাচারাল পার্কের মতো বড় প্রকল্পও রয়েছে। সাভার পুলিশ টাউনেও একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে।

বেনজীর ও তার পরিবারের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্তে বেনজীর আহমেদের নিজের নামে ৯ কোটি ২৫ লাখ, স্ত্রীর নামে ২১ কোটি ৩৪ লাখ এবং দুই মেয়ের নামে ১২ কোটি ৮৭ লাখ টাকার সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তার দুই মেয়ের নামে বেস্ট হোল্ডিংস ও পাঁচতারা হোটেল লা মেরিডিয়ানে দুই লাখ শেয়ার রয়েছে। পূর্বাচলে ৪০ কাঠার একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য কমপক্ষে ৪৫ কোটি টাকা। একই এলাকায় আরও ১০ বিঘা জমি রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ২২ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন

গোপালগঞ্জে সাভানা ফার্ম প্রোডাক্টস, সাভানা অ্যাগ্রো লিমিটেড, সাভানা ন্যাচারাল পার্ক, সাভানা ইকো রিসোর্ট ও সাভানা কান্ট্রি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সাভানা অ্যাগ্রোতে ২০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনের কোম্পানিতে স্ত্রী চেয়ারম্যান, বড় মেয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ছোট মেয়ে পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।

‘এমএস একটি শিশির বিন্দু’ নামের প্রতিষ্ঠানে বড় মেয়ের ৫ শতাংশ এবং ছোট মেয়ের ৫ শতাংশ মালিকানা রয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানে স্ত্রী জিশান মির্জার ১৫ শতাংশ অংশীদারি রয়েছে, অর্থাৎ মোট ২৫ শতাংশ মালিকানা পরিবারটির হাতে।

বিদেশেও সম্পদ

বেনজীর আহমেদ বিলাসী জীবনযাপন করতেন। পুলিশের চাকরি শেষ হওয়ার পর তিনি সপরিবারে বিদেশে পাড়ি জমান। তিনি দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও পর্তুগালসহ কয়েকটি দেশে ঘুরে বেড়ান। এসব দেশে বিপুল অর্থ পাচার ও বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগের তথ্য পেয়েছে দুদক। যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়ায় তার কিছু স্থাবর সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব জব্দের আদেশও দেওয়া হয়।

সম্পত্তি ক্রোক

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্তে নেমে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের সন্ধান পায়। তদন্ত শেষে ১১৯টি দলিলে উল্লেখিত সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেয় ঢাকার একটি আদালত।

দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল আদালতের বিচারক মো. আস-শামস জগলুল হোসেন এই আদেশ দেন। এসব দলিলে ঢাকার গুলশানের চারটি ফ্ল্যাটও ক্রোকের নির্দেশ রয়েছে। এর মধ্যে দুটি ফ্ল্যাট ২ হাজার ৪২ বর্গফুট এবং দুটি ফ্ল্যাট ২ হাজার ৫৩ বর্গফুটের।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুরের রাজৈর থানার ১১৪টি দলিলের কয়েক শ বিঘা জমি, সাভারের একাধিক জমি, বেনজীর পরিবারের সাভানা অ্যাগ্রো লিমিটেড, সাভানা ইকো রিসোর্ট এবং ‘একটি শিশিরবিন্দু’ নামের কোম্পানির সব সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকের সঞ্চয়পত্রে থাকা ৩০ লাখ টাকা, শান্তা ও লঙ্কা-বাংলায় বেনজীর পরিবারের শেয়ার এবং আরও ১৫টি কোম্পানিতে বিভিন্ন সদস্যের নামে থাকা আংশিক শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এসব সম্পদ বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী জিশান মির্জা, বড় মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর এবং ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের নামে রয়েছে।

সম্পদ ত্রাণ তহবিলে

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সব সম্পদ প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে হস্তান্তর করেছে দুদক। ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর এ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। দুদক প্রধান কার্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জানান, বেনজীর আহমেদের ফ্ল্যাট থেকে জব্দ করা মালামাল ত্রাণ তহবিলে জমা দেওয়া হয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা যায়, আদালতের নির্দেশে গুলশানের র‍্যাংকন আইকন টাওয়ারের ফ্ল্যাটগুলো থেকে জব্দ করা পচনশীল মালামাল, কাপড়চোপড়, তৈজসপত্র ও রান্নাঘরের জিনিসপত্র নিলামের নমুনা রেখে বাকি মালামাল ত্রাণ তহবিলে জমা দেওয়া হয়।

আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে কমিশন। কমিটি পরবর্তীতে মালামাল হস্তান্তর সম্পন্ন করে।

পূর্বে এসব মালামাল একজন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে কমিশনের ২৫/২০২৫ নম্বর সভায় বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad