সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করেনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন করে ‘সহকারী শিক্ষক (সংগীত)’ পদটি সৃষ্টির যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তাতে সম্মতি দেয়নি।
রোববার বিকালে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ তথ্য জানান। এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
অধিবেশনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম জানতে চান, ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী আলোচিত সহকারী শিক্ষক (সংগীত) পদটি সৃষ্টির বর্তমান অবস্থা কী। জবাবে শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত বিষয়ের শিক্ষক পদটি সৃজনের বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে অসম্মতি দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে সংগীত শিক্ষা চালুর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নানা বিতর্ক এবং ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষা চালুর সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা ও বিরোধিতা করে আসছিল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশসহ বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক সংগঠন। তাদের দাবি ছিল, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে বরং এর পরিবর্তে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক।
এর আগে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫’ এর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। সেই মূল বিধিমালায় অন্যান্য সাধারণ বিষয়ের পাশাপাশি সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়েও সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিশেষ সুযোগ রাখা হয়। তবে বিভিন্ন সংগঠনের টানা আন্দোলন ও আপত্তির মুখে গত বছরের নভেম্বরে এই বিধিমালা সংশোধন করতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার।
সংশোধিত বিধিমালায় শুধুমাত্র প্রধান শিক্ষক ও সাধারণ সহকারী শিক্ষক নিয়োগের কথা বলা হয় এবং সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগও এই পদ সৃষ্টির প্রস্তাবে চূড়ান্ত অসম্মতি জানায়।
স্থায়ী পাবলিক পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ
পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম সচল রাখতে দেশে পৃথক বা স্থায়ী পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রস্তাব বর্তমানে অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সংসদ সদস্য ইকরামুল বারী টিপুর প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী এ কথা জানান।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, দেশের প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থাপনাকে আরও সুশৃঙ্খল, নিরপেক্ষ ও মানসম্মত করার পাশাপাশি পরীক্ষার সময়ে স্কুল-কলেজের নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে স্থায়ী পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হলে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান, বিদ্যমান অবকাঠামো এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে উপজেলা, জেলা বা আঞ্চলিক পর্যায়ে স্বতন্ত্র পাবলিক পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। সমীক্ষার সুপারিশ ও পরবর্তী উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
১৮৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস
সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, বিগত ২০২৪ ও ২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন সর্বমোট ১৮৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা, প্রধান ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক সহায়তা প্রদান, দুর্বল ফলাফলের কারণ চিহ্নিত করতে নিয়মিত মনিটরিং এবং শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণে বিশেষ ক্যাচ-আপ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা।
কল্যাণ সুবিধা পাওয়ার অপেক্ষায় ৪৪ হাজার বেসরকারি শিক্ষক
যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. গোলাম রছুলের তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ায় প্রতিবছর বড় অঙ্কের আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ট্রাস্টের বার্ষিক মোট আয় প্রায় ৬৮৪ কোটি টাকা হলেও অবসরপ্রাপ্তদের সুবিধা দিতে প্রতিবছর প্রয়োজন হচ্ছে প্রায় ৮৪০ কোটি টাকা। ফলে প্রতিবছর প্রায় ১৫৬ কোটি টাকার ঘাটতি হচ্ছে।
এই ঘাটতির কারণে বর্তমানে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রায় ৪৪ হাজার কল্যাণ সুবিধার আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এই অনিষ্পন্ন আবেদনগুলো দ্রুত মেটাতে বর্তমানে এককালীন প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন।
তবে এই সংকটের মধ্যেও ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৯ হাজার ২৮৪ জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীকে ইতোমধ্যে ৫৫৩ কোটি ৬৩ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭৪ টাকা কল্যাণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অনিষ্পন্ন আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে সরকার বিষয়টি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে বলে মন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করেন।


