রাজধানীর শহীদ স্মৃতি পুলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ইব্রাহিম খলিল খান। ২০২৫ সালের পঞ্চম শ্রেণির ফলাফলের ভিত্তিতে তার সাবেক স্কুল সাভার ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে তাকে সরকারি বৃত্তি পরীক্ষার জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সে তার সাবেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এই পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে শিক্ষার্থীরা যখন মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনা শুরু করেছে, তারও কয়েক মাস পর এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইব্রাহিমের বর্তমান স্কুলের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন ও প্রথম সাময়িক পরীক্ষার সময়ের সঙ্গে বৃত্তি পরীক্ষার সূচি মিলে যাওয়ায় সে অংশ নিতে পারেনি।
ইব্রাহিমের বাবা কামরুজ্জামান খান টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, যদি এই পরীক্ষা গত ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হতো, তবে ইব্রাহিম অবশ্যই অংশগ্রহণ করত। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার প্রায় চার মাস পর সে এখন পুরনো পড়াশোনার বদলে বর্তমান পাঠ্যক্রমেই বেশি মনোযোগ দিতে আগ্রহী বলে তিনি জানান।
সারা দেশেই ফুটে উঠেছে এই চিত্র। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দীর্ঘ ১৬ বছর পর প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত নিলেও নানা জটিলতায় তা পিছিয়ে এপ্রিলের মাঝামাঝিতে চলে যায়। গত ১৫ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলায় বিশেষ সূচিতে ১৭ থেকে ২০ এপ্রিল পরীক্ষা নেওয়া হয়।
শিক্ষাবর্ষের মাঝপথে পরীক্ষা হওয়ায় এবং সেশন পরিবর্তনের কারণে বৃত্তি পরীক্ষায় উপস্থিতির হার ছিল অনেক কম। শিক্ষাবিদরা এই আলাদা বৃত্তি পরীক্ষার সমালোচনা করে একে বৈষম্যমূলক ও অপ্রয়োজনীয় বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, এটি কেবল মেধাবীদের পুরস্কৃত করে এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের আরও দূরে ঠেলে দেয়। তারা পরীক্ষার চাপ না বাড়িয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান।
বৃত্তি পরীক্ষার প্রথম দিন থেকেই দেখা গেছে, প্রায় প্রতি তিনজনে একজন শিক্ষার্থী অনুপস্থিত। এ বছর মোট ছয় লাখ ৪৫ হাজার ৪১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হলেও অংশ নিয়েছে চার লাখ ২০ হাজার দুইজন। অর্থাৎ উপস্থিতির হার ছিল ৬৫ দশমিক ১১ শতাংশ।
কোনো কোনো কেন্দ্রে অনুপস্থিতির হার ছিল আরও বেশি। গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রিয়াজ পারভেজ জানান, তার কেন্দ্রে ৭২৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৩৭১ জন উপস্থিত হয়েছিল। তিনি বলেন, প্রাথমিক শেষ করে অনেক শিক্ষার্থী ভালো স্কুলের খোঁজে এলাকা পরিবর্তন করে। ছোট শিশুদের জন্য যাতায়াত একটি বড় সমস্যা এবং তাদের ষষ্ঠ শ্রেণির পরীক্ষাও সামনে চলে এসেছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে অংশ নিয়েছে নয়জন। মানিকগঞ্জের গোলাম মনির হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনজনের মধ্যে মাত্র একজন এবং গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার সুলতানপুর বড়াইপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়জনের মধ্যে চারজন পরীক্ষায় বসেছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (শিক্ষা) মো. আব্দুর রেজ্জাক সিদ্দিকী জানান, ডিসেম্বরের পরীক্ষা এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হওয়ায় উপস্থিতি কিছুটা কম। তবে প্রতিকূলতার মধ্যেও পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় তারা সন্তুষ্ট। তিনি আরও জানান, চলতি বছরের বৃত্তি পরীক্ষা ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে উপস্থিতি বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাপের খবরও পাওয়া গেছে। রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মনোনীত চারজন শিক্ষার্থীর সবাই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। ওই স্কুলের একজন শিক্ষক জানান, শিক্ষা অফিস থেকে সবাইকে উপস্থিত রাখার মৌখিক নির্দেশ ছিল। তারা নিজেদের পকেট থেকে টাকা খরচ করে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ভাড়া দিয়ে চারদিন কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেন, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ায় সর্বোচ্চ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ, যিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শিক্ষাবিষয়ক পরামর্শক কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন, তিনি এই আলাদা বৃত্তির সিদ্ধান্তকে ত্রুটিপূর্ণ মনে করেন। তিনি বলেন, স্কুলে যারা ভালো করে তারাই কেবল এই পরীক্ষার সুযোগ পায়। ফলে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা বাদ পড়ে যায়। এটি অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কোনো উপকারে আসবে না।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরীও এই পরীক্ষার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, বার্ষিক পরীক্ষার পর আবার বৃত্তি পরীক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া নিরর্থক। তার মতে, মানসম্মত পাঠদান ও জীবনমুখী দক্ষতা তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এ বছর মোট ৮২ হাজার ৫০০ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পাবে। এর মধ্যে ৩৩ হাজার জন ট্যালেন্টপুল বা মেধা বৃত্তি এবং ৪৯ হাজার ৫০০ জন সাধারণ বৃত্তি পাবে। মেধা বৃত্তিপ্রাপ্তরা এককালীন পাবে ২২৫ টাকা আর প্রতি মাসে পাবে ৩০০ টাকা। সাধারণ বৃত্তিপ্রাপ্তরা এককালীন ২২৫ টাকা এবং মাসিক ২২৫ টাকা করে পাবে। মোট বৃত্তির ৮০ শতাংশ সরকারি স্কুলের এবং ২০ শতাংশ বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা পাবে।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা (পিইসি) চালুর পর আলাদাভাবে বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।


