জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় তীব্র গ্যাস সংকটে পড়েছে শিল্পনগরী গাজীপুর। সিএনজি স্টেশন থেকে শিল্পকারখানা সবখানেই গ্যাসের জন্য হাহাকার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনগুলোতে লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না যানবাহন চালকেরা।
এর মধ্যেই বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে অনুমোদনহীনভাবে খোলা সিলিন্ডার এবং কাভার্ডভ্যানে বিশেষ কৌশলে রাখা শত শত সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। এতে সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তির পাশাপাশি তৈরি হয়েছে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
২০২২ সালের ১৩ অক্টোবর সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সিলিন্ডারবোঝাই কাভার্ডভ্যানে গ্যাস নেওয়ার সময় বিস্ফোরণ ঘটে পাঁচজন দগ্ধ হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পাঁচজনই মারা যান। ওই ঘটনায় গাজীপুরের বড়বাড়ি এলাকার হাজী ওয়াহেদ আলী সরকার সিএনজি ফিলিং স্টেশনের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং স্টেশনটির গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয় তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। সেই দুর্ঘটনার পরও ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুমোদনহীন পন্থায় গ্যাস বিক্রির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে সেই একই ধরনের কাভার্ডভ্যানে শত শত সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহের দৃশ্যও প্রতিনিয়ত চোখে পড়ছে। বিশেষ করে এসব সিলিন্ডারের নিরাপত্তা পরীক্ষা, বৈধতা, মেয়াদ এবং পরিবহনের অনুমোদন রয়েছে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
সরেজমিনে টঙ্গী-গাজীপুরের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাস নেওয়ার জন্য শত শত যানবাহন সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে, একই স্টেশনের একটি নজেল দখল করে চার-পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত অবস্থান করছে সিলিন্ডারবাহী কাভার্ডভ্যান। এসব ভ্যানে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, কাভার্ডভ্যানে গ্যাস দেওয়ার সময় স্টেশনের অন্য নজেলগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যায়। ফলে সাধারণ যানবাহনগুলোকে আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অপেক্ষা শেষে গ্যাস নিতে গেলেও চাপ না থাকায় পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না। অন্যদিকে, অনুমোদন ছাড়া সিলিন্ডারবোঝাই একেকটি কাভার্ডভ্যানে এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে।
কাভার্ডভ্যানের ভেতরে দেখা যায়, শত শত সিলিন্ডার কৌশলে একটির সঙ্গে আরেকটি দাঁড় করিয়ে বিশেষভাবে ওয়্যারিং করে রাখা হয়েছে। এরপর ফিলিং স্টেশনের নজেল সংযোগ দিয়ে সিলিন্ডারগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব সিলিন্ডারের মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ বা মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার করা হলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
ক্ষোভ প্রকাশ করে এক চালক বলেন, ‘সিলিন্ডারবোঝাই কাভার্ডভ্যানে গ্যাস দেওয়ার কারণে আমরা গ্যাস পাচ্ছি না। কাভার্ডভ্যানের নজেল খুললেই গ্যাসের চাপ বেড়ে যায়। গাজীপুরের সবগুলো ফিলিং স্টেশনে এভাবে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। মাঝে কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর আবারও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে তারা গ্যাস বিক্রি করছে। আমরা বৈধ গাড়ি নিয়েও গ্যাস পাচ্ছি না, অথচ তারা দিনভর প্রতিটি ফিলিং স্টেশন থেকে কাভার্ডভ্যানে গ্যাস নিচ্ছে।’
তীব্র গ্যাস সংকটে সাধারণ যানবাহন যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছে, সেখানে একই স্টেশন থেকে কীভাবে একসঙ্গে শত শত সিলিন্ডারে বিপুল পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে এমন প্রশ্নও তুলেছেন চালকেরা।

এদিকে, সিএনজি স্টেশন থেকে কাভার্ডভ্যানে সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস নেওয়ার বৈধ কাগজ আছে কি না জানতে চাইলে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমই) একটি চিঠি দেখান।
বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বরাবর দেওয়া ওই চিঠিতে বিজিএমইএ জানায়, গ্যাস সংকটের কারণে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গ্যাসের চাপ শূন্য পিএসআই পর্যন্ত নেমে আসায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং নির্ধারিত লিড টাইম অনুযায়ী রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় রপ্তানি আদেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে তৈরি পোশাক সরবরাহ নিশ্চিত করতে সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস সংগ্রহ করতে ইচ্ছুক রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও নির্দেশনা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানায় বিজিএমইএ।
বিজিএমইএর চিঠিতে সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও সহযোগিতার অনুরোধ করা হলেও, এটি তিতাস গ্যাসের দেওয়া কোনো অনুমোদনপত্র নয়। তবে এই চিঠি দেখিয়েই কাভার্ডভ্যানবোঝাই বা খোলা সিলিন্ডারে গ্যাস বিক্রির অনুমতির কথা জানায় অধিকাংশ সিএনজি স্টেশন।
জানতে চাইলে টঙ্গীর মিলগেট এলাকার মাশলুক সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার খন্দকার সমীর উদ্দিন জানান, তিতাস গ্যাসের এমডি সিলিন্ডারবোঝাই কাভার্ডভ্যানে গ্যাস দেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। তবে তিনি এ দাবির পক্ষে কোনো অনুমতিপত্র দেখাতে পারেননি।
এ বিষয়ে গাজীপুর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) প্রকৌশলী মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘তিতাস গ্যাস খোলা সিলিন্ডার বা কাভার্ডভ্যানবোঝাই সিলিন্ডারে গ্যাস বিক্রির কোনো বৈধ অনুমতি দেয়নি, বরং সিএনজি স্টেশনগুলোকে চিঠি দিয়ে খোলা সিলিন্ডারে গ্যাস বিক্রিকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহ ও এর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয় দেখভালের দায়িত্ব বিস্ফোরক পরিদপ্তরের।’
গ্যাস সিলিন্ডার সংক্রান্ত লাইসেন্স প্রদান এবং নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন হলে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ারও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বলে জানান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশনের এই কর্মকর্তা।


