আফরা তায়েবা/টাইমস রিপোর্ট
গ্রামীণফোনের বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব বিরোধ আদালতের বাইরে সালিশ বা আরবিট্রেশনের মাধ্যমে নিষ্পত্তির প্রস্তাবে শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) আইন বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে একমত হতে না পারায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় টেলিকম রাজস্ব বিরোধ আদালতের বাইরে মীমাংসার উদ্যোগ এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
টেলিযোগাযোগ আইনের অধীনে বিধিবদ্ধ এই ধরনের রাজস্ব দাবি সালিশযোগ্য কি না, তা নিয়ে বিটিআরসির নিজস্ব আইন পরামর্শকরাই বিভক্ত মত দিয়েছেন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এতে দেনার অংক কমিয়ে এনে দ্রুত বিবাদ নিষ্পত্তির চেষ্টায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে গ্রামীণফোন।
গত বছরের জুলাইয়ে ১২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার নিরীক্ষা দাবি নিষ্পত্তিতে সালিশ প্রক্রিয়া শুরু করার আবেদন করে গ্রামীণফোন।
ছয় বছর ধরে স্থানীয় আদালতে ঝুলে থাকা এই বিরোধ এখন বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এমদাদ উল বারী সম্প্রতি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকারের জন্য আমরা সালিশ প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য আইনগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব পর্যালোচনা করছি।’
প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘আমরা আমাদের আইনজীবীদের কাছে আনুষ্ঠানিক মতামত চাইব।’
এর আগে অক্টোবরে গ্রামীণফোনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, কার্যকর সালিশ ব্যবসা পরিচালনায় সব লাইসেন্সধারীর জন্য সহায়ক হতে পারে। গ্রামীণফোন তাদের উদ্বেগের বিস্তারিত তুলে ধরেছে এবং অন্তর্বর্তী সরকার একটি ‘উইন উইন সমাধান’ নিয়ে ইতিবাচক।
তিনি আরও বলেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার বিদেশি অপারেটরদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও কিছু স্থানীয় শিল্পপতিদের উপেক্ষা করছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এখন সব পক্ষের দিকেই নজর রাখছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় টেলিকম বিরোধ
এই বিরোধের সূত্রপাত ২০১৯ সালের এপ্রিলে। বিটিআরসি একটি নিরীক্ষকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৯৯৭ থেকে ২০১৪ সময়ের জন্য গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে প্রায় ১২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার অডিট দাবি তোলে। এই দাবির মধ্যে বিটিআরসি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অংশ রয়েছে।
গ্রামীণফোন একই বছর ঢাকার আদালতে মামলা দায়ের করে এ দাবি চ্যালেঞ্জ করে। ছয় বছর পরও মামলাটি নিষ্পত্তি হয়নি।
গ্রামীণফোন বলছে, দেওয়ানি আদালতের দীর্ঘসূত্রতা এবং সম্ভাব্য আপিলের কারণে দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা কম।
২০২৫ সালের জুলাইয়ের আবেদনে কোম্পানিটি জানিয়েছে, বিরোধটি কারিগরি ও হিসাবসংক্রান্ত জটিলতায় ভরা। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত সালিশি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হতে পারে।
গ্রামীণফোনের যুক্তি, সালিশ সময় সাশ্রয়ী এবং সব পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য যৌক্তিক সমাধানের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে।
বিটিআরসির ভেতরে বিভক্ত আইনগত মত
টাইমস অব বাংলাদেশের হাতে আসা নথিপত্র বলছে, গ্রামীণফোনের প্রস্তাব নিয়ে বিটিআরসির আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে স্পষ্ট মতবিরোধ রয়েছে।
কমিশনের একটি রিটেইনার আইন ফার্ম জাস্টিসিয়ার্স বলেছে, সালিশ আইন ২০০১-এর অধীনে উভয় পক্ষ চাইলে স্বেচ্ছায় সীমিত পরিসরে সালিশ চুক্তিতে যেতে পারে। এতে দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তারা পরামর্শ দিয়েছে, এমন কোনো চুক্তি যেন কেবল বর্তমান বিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রক দাবি বা বৃহত্তর কাঠামোকে প্রভাবিত না করে।
তবে আরেক আইন ফার্ম ক্যাপিটাল ল চেম্বার এবং কমিশনের প্যানেল আইনজীবী প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছেন।
ক্যাপিটাল ল চেম্বারের মতে, এই অডিট দাবি টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১-এর অধীনে বিধিবদ্ধ দায় থেকে এসেছে। ফলে এটি কোনো বেসরকারি বাণিজ্যিক বিরোধের মতো সালিশযোগ্য নয়।
তারা বলেন, আদালতগুলো ধারাবাহিকভাবে বিধিবদ্ধ এ রাজস্ব দাবি নিয়ে রায় দিয়েছে। আপিল বিভাগের ২০২০ সালের আদেশের ভিত্তিতে গ্রামীণফোন বিবাদমান অংকের মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা জমাও দিয়েছে।
ফার্মটি আরও বলেছে, সালিশে গেলে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ায় ছেদ পড়বে এবং নতুন করে প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এতে বিলম্ব বাড়বে এবং ভবিষ্যতে রেগুলেশন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক নজির তৈরি হতে পারে।
কমিশনের প্যানেল আইনজীবী ও সালিশ বিশেষজ্ঞ খালেদ হামিদ চৌধুরী বলেছেন, বর্তমানে বিটিআরসি ও অপারেটরদের মধ্যে কোনো কার্যকর সালিশি চুক্তি নেই। নতুন চুক্তি করলে তা জনস্বার্থভিত্তিক নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এমনকি কোনো সালিশি রায় জননীতি ও সালিশযোগ্যতার প্রশ্নে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে পারে।
তার মতে, আইনগতভাবে নিরাপদ পথ হলো আদালতের মধ্যস্থতা কাঠামোর মধ্যেই সমাধানের চেষ্টা করা, যেখানে কমিশনের বিধিবদ্ধ ক্ষমতা সংরক্ষিত থাকবে।
এই পরস্পরবিরোধী মতামতের কারণে বিটিআরসি এখনো চূড়ান্ত অবস্থান নিতে পারেনি।
একাধিক সূত্র বলছে, সালিশ ও মধ্যস্থতার সুবিধা অসুবিধা নিয়ে এক মাস আগেই আরও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা নিরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা জাতীয় নির্বাচনের আগে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
নিম্ন আদালতে মধ্যস্থতার শুনানি পেছাল
গ্রামীণফোন মামলায় নিম্ন আদালতে ১১ জানুয়ারি মধ্যস্থতার শুনানি নির্ধারিত থাকলেও তা হয়নি।
গ্রামীণফোনের কমিউনিকেশন প্রধান শরফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ এপ্রিল।
আইনজীবীরা বলছেন, এটি সালিশ আবেদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। দেওয়ানি মামলায় নিয়মিত মধ্যস্থতার সুযোগের অংশ হিসেবে আদালত এই শুনানি করে থাকে।
গ্রামীণফোন একা নয়। একই ধরনের অডিট প্রক্রিয়ায় বিটিআরসি ২০১৯ সালে রবি আজিয়াটার কাছেও ৮৬৭ কোটি ২৪ লাখ টাকার দাবি তোলে।
রবিও ঢাকার আদালতে মামলা লড়ছে, যা এখনো বিচারাধীন।
সালিশের আইনগত ভিত্তি নিয়ে সন্দেহ থাকায় রবি ২০২৫ সালে মধ্যস্থতার পথ বেছে নেয়।
রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম বলেন, তারা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির নীতিকে সমর্থন করেন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে বিটিআরসির আইনজ্ঞরা মনে করছেন, রবির প্রস্তাবিত মধ্যস্থতার শর্তে এমন ধারা রয়েছে, যা মধ্যস্থতা ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত সালিশ বাধ্যতামূলক করে তুলতে পারে। ফলে প্রস্তাবটি সতর্ক পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
সালিশে যাওয়ার বাধ্যবাধকতার শর্ত না তুলে নিলে মধ্যস্থতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানেরও মত দিয়েছে একজন আইনজ্ঞ।
রবি মামলার মধ্যস্থতার শুনানি নির্ধারিত ছিল ২৬ জানুয়ারি, তবে এটিও এপ্রিল পর্যন্ত পিছিয়েছে।
গ্রামীণফোন ও রবির কোনো ক্ষেত্রেই সালিশ বা মধ্যস্থতা নিয়ে বিটিআরসি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।
অন্তর্বর্তী সরকার আপসের মনোভাব দেখালেও রাজস্ব আদায়ের জনস্বার্থভিত্তিক চরিত্র এবং আইনগত ঝুঁকির কারণে বিলিয়ন ডলারের এই অডিট দাবির নিষ্পত্তিতে সালিশ বেছে নেওয়া হবে কি না, তা অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে।


