ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকা, উপ-রাষ্ট্রপতির পদ সৃজন, সংসদের উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং উচ্চকক্ষে ২০ শতাংশ নারী নিশ্চিত করা হবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করেছে বিএনপি।
শুক্রবার বিকালে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ ইশতেহার ঘোষণা করেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান
অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, দেশি-বিদেশি রাষ্ট্রদূত, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, জাতীয় বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের গণ্যমান্য এবং সুশীল সমাজের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ইশতেহারের রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারে গণতন্ত্র ও জাতিগঠন অংশে বলা হয়েছে, ৩১ দফা ও জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন করা হবে। মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এবং ন্যায়পরায়ণ বাংলাদেশ গঠন করা হবে। এ ছাড়া ফ্যাসিবাদ ও তাঁবেদারত্বের পুনরাবৃত্তি দমন, বৈষম্য দূরীকরণ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, ভোটকে রাষ্ট্রক্ষমতার একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, রাষ্ট্রের প্রত্যেক স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলসমূহকে সঙ্গে নিয়ে জনকল্যাণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন করা হবে।
আরও বলা হয়, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় বিএনপি। বিএনপি বিশ্বাস করে জাতি গঠন মানে কেবল রাষ্ট্র পরিচালনা নয়, বরং বিভাজন অতিক্রম করে একটি অভিন্ন জাতীয় সত্ত্বা নির্মাণ।
বলা হয়, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের অবসান ঘটানো, আমাদের একটাই পরিচয়-আমরা সবাই বাংলাদেশি। বাংলাদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, পাহাড়ের মানুষ, সমতলের মানুষ, ধনী-দরিদ্র্য নির্বিশেষে সবাই মিলে আমরা গড়ে তুলব জাতীয় ঐক্য ও অখণ্ড জাতীয় সত্ত্বা।’ ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠন করা হবে বলেও ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি।
ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বিএনপি বলেছে, তারা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ করবে। সেই সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের কল্যাণার্থে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের সার্বিক সহায়তা দেওয়া হবে।
সাংবিধানিক সংস্কার অংশে বলা হয়েছে, সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা হবে। এ ছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অগণতান্ত্রিক সংশোধনী বাতিল, ৩১ দফার ভিত্তিতে সংস্কার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃজন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার, উচ্চকক্ষে ২০ শতাংশ নারী, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কার করবে দলটি।
সুশাসন অংশে দুর্নীতি নিয়ে বলা হয়েছে, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জনগণের রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই হবে সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার। এজন্য দুর্নীতি দমনে পদ্ধতিগত ও আইনি সংস্কার করা হবে। এ ছাড়া উন্মুক্ত দরপত্র ও রিয়েল-টাইম অডিট নিশ্চিত করা, সিঙ্গেল-উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স’ প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন, সরকারি ব্যয় ও প্রকল্পের ‘পারফরম্যান্স অডিট’ বাস্তবায়ন,অর্থপাচার রোধ ও ফ্যাসিস্ট আমলের পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনা এবং ন্যায়পাল নিয়োগ করা হবে।
সুশাসন অংশে আরও বলা হয়, গুম প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। বিচার বিভাগ নিয়ে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, মামলার জট হ্রাস ও বিচারপ্রাপ্তি হয়রানিমুক্ত করা, দুর্নীতিমুক্তকরণে বিচারসেবার আধুনিকায়ন, ‘সংবিধানের ৯৫(২) (গ) অনুযায়ী বিচারপতি নিয়োগে আইন’ প্রণয়ন, ‘জুডিশিয়াল কমিশন’ গঠন এবং বর্তমান বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন পৃথক সচিবালয়কে আরও শক্তিশালী করা হবে। এ ছাড়া ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষা করার অঙ্গীকার করেছে বিএনপি।
জনপ্রশাসন বিষয়ে বিএনপি বলেছে, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ, স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে পাঁচ লক্ষ সরকারি শূন্য পদে কর্মচারি নিয়োগ, ‘প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন’ গঠন, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন এবং শক্তিশালী পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন করা হবে। পাশাপাশি বেসরকারি চাকরিজীবীরা যাতে প্রাপ্য ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়ন করা হবে। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পেশাদারত্ব বৃদ্ধি ও দলীয়করণ রোধ করা হবে।
পুলিশ প্রশাসন নিয়ে বিএনপি অঙ্গীকার করেছে, পুলিশ বাহিনীকে একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজের উপযোগী ও শক্তিশালী করে জনবান্ধব ও সেবাবান্ধব পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া পুলিশের নৈতিক মনোবল পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও জনআস্থা অর্জন, অন-লাইন অভিযোগ-দায়ের সুবিধা সম্প্রসারণ, ‘পুলিশ কমিশন’ আইন পুনঃনিরীক্ষণ এবং পুলিশের দায়িত্ব পালনে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করা হবে।
দলটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, স্থানীয় সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সমাধান নিশ্চিত করা এবং ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে একটি উপযুক্ত শক্তিশালী স্থানীয় প্রশাসন গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বৃদ্ধি ও খবরদারিমুক্ত করা এবং জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা হবে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উদ্যোগে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে বছরে অন্তত একবার উন্নয়ন কাজের উন্মুক্ত সভা আয়োজন করা হবে।
বিএনপি মানবিক, ন্যায়সঙ্গত ও মর্যাদাভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে, যেখানে রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে। দলটি পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে দেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৎস্যচাষী ও প্রাণিসম্পদ খামারীদের ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান করবে। বেসরকারি খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য বার্ধ্যক্যের দুর্দশা লাঘবের উদ্দেশ্যে পেনশন প্রদানের লক্ষ্যে ‘পেনশন ফান্ড’ গঠন করবে। এ ছাড়া দারিদ্র্য-পীড়িত ও পশ্চাৎপদ অঞ্চলে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পিতামাতার ভরণপোষণ আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং হতদরিদ্র এতিম শিশুদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করবে।
দলটি বলেছে তারা বিশ্বাস করে, নারী অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলে জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায় অর্জন সহজ হবে। বিএনপি নারীদের তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সুরক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে সমাজে তাদের সম্পৃক্ততা এবং ক্ষমতাকে দৃঢ় করবে। দলটি অঙ্গীকার করেছে, পরিবারের নারী প্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়া হবে। এ ছাড়া স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, লিঙ্গ-ভিত্তিক ও অনলাইন সহিংসতা, বিদ্বেষ এবং বুলিং নিবোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বাস্তবায়ন, কর্মস্থলে ‘ডে-কেয়ার’ ও ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার এবং স্বাস্থ্য ও হাইজিনের জন্য ‘ভেন্ডিং মেশিন’ স্থাপন করবে দলটি।
কৃষক ও কৃষি উন্নয়ন নিয়ে বিএনপির লক্ষ্য হলো আত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু, প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃষক-কেন্দ্রিক একটি আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা। দলটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কৃষক কার্ড ও কৃষকের সার্বিক সুরক্ষা দেওয়া হবে। এ ছাড়া ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফ, ক্ষুদ্র ঋণের এক বছরের কিস্তি সরকার কর্তৃক পরিশোধ, বরেন্দ্র প্রকল্প পুনঃচালুকরণ, ফসলের ন্যায্যমূল্য ও কৃষিজমি সুরক্ষা এবং ক্রয় কেন্দ্র নির্মাণ, খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
খাদ্যে ও ওষুধে ভেজাল রোধে মনিটিরিং ব্যবস্থা জোরদার ও আইনি ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে বিএনপি। এ ছাড়া শক্তিশালী ও কার্যকর ‘খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ গঠন এবং খাদ্য আমদানিতে স্বচ্ছতা আনয়ন ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথা বলেছে দলটি।
‘করবো কাজ, গড়বো দেশ’ নীতির ভিত্তিতে বিভিন্ন খাতভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা বিএনপির প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে। দলটি অঙ্গীকার করেছে, বেকারভাতা, আইটি পার্কগুলোতে অফিস স্পেস ও ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা দেওয়া হবে। এ ছাড়া ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোসিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি এসএমই ঋণ প্রদান ও অ্যামাজন, আলিবাবায় সংযুক্তকরণ, মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সুবিধা চালু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান এবং ব্যবসা সহজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করবে।


