তদন্ত প্রতিবেদন পরিবর্তন করতে হলে দিতে হবে আট হাজার টাকা। বিকাশে টাকা ঢুকলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বদলে যাবে একটি অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন।
হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়ে এমনই এক বার্তা দিয়েছেন যশোর সদর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম সাইফুল আলম।
ভুক্তভোগী হাসানুল কাদির নামে এক ব্যক্তি এই অভিযোগ তুলেছেন। সাইফুল আলম বর্তমানে মণিরামপুর উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন।
ভুক্তভোগী হাসানুল কাদিরের অভিযোগ, যশোরের মণিরামপুর উপজেলার কাশীপুর সিদ্দিকীয়া আলিম মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদ গঠন নিয়ে ওঠা একটি অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন পরিবর্তন করার বিনিময়ে এই টাকা দাবি করেছেন ওই শিক্ষা কর্মকর্তা।
হাসানুল কাদির জানান, কাশীপুর সিদ্দিকীয়া আলিম মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদ দীর্ঘকাল ধরে কোনো নির্বাচন ছাড়া ‘পকেট কমিটি’ দিয়ে চালানো হচ্ছে। এই অনিয়মের বিষয়ে তিনি স্থানীয় প্রশাসন, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) লিখিত অভিযোগ করেন।
তার অভিযোগের ভিত্তিতে, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) একটি নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক মতামতসহ প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেয়। বিষয়টি মাদ্রাসা সংক্রান্ত হওয়ায় তদন্তের ভার পড়ে মণিরামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের ওপর। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে অনীহা প্রকাশ করেন অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম সাইফুল আলম। এই সংক্রান্ত একটি সংবাদ যশোরের স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশের পর তাড়াহুড়ো করে একটি প্রতিবেদন জমা দেন তিনি।
প্রতিবেদনে ওই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, অভিযোগকারী হাসানুল কাদির বর্তমান সভাপতির বিরুদ্ধে অধ্যক্ষের সহায়তায় সুকৌশলে কোনো নির্বাচন না দিয়ে মনগড়া পছন্দের তালিকা যুক্ত করার অভিযোগ এনেছেন। কিন্তু অধ্যক্ষ যখন গভর্নিং বডির অনুমোদনের জন্য বোর্ডে তালিকা পাঠান, তখন সভাপতি হিসেবে অভিযোগকারীর নাম এক নম্বরে ছিল। সে সময় তিনি কেন আপত্তি করেননি, এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে কোনো সঠিক জবাব দিতে পারেননি।
এ ছাড়া অভিযোগকারী সুনির্দিষ্টভাবে কোনো সদস্যের নাম উল্লেখ করে বলেননি যে, কাকে বিধি-বহির্ভূতভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে। তাই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় সদস্যদের ব্যাপারে মতামত দেওয়া সম্ভব হলো না।
তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেন, বাদী, বিবাদী, সাক্ষী এবং প্রিজাইডিং অফিসারের বক্তব্য ও নির্বাচন সংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অভিযোগকারীর আনা অভিযোগ সঠিক নয়।
এই তদন্ত প্রতিবেদনটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়নি দাবি করে তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন অভিযোগকারী হাসানুল কাদির। অভিযোগ, এ সময় প্রতিবেদনটি পরিবর্তন করে দেওয়ার কথা বলে আট হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম সাইফুল আলম।
হোয়াটসঅ্যাপে এ সংক্রান্ত কথোপকথনের কয়েকটি স্ক্রিনশটে দেখা যায়, অভিযোগকারী হাসানুল কাদির ওই কর্মকর্তাকে বলছেন, ‘সঠিক প্রতিবেদনটা দেন স্যার’। জবাবে এস এম সাইফুল আলম লিখেছেন, ‘এখনি তাহলে সাত হাজার টাকা দিয়ে জানাও’।
ভুক্তভোগী হাসানুল কাদিরের দাবি, কথোপকথনের শুরুতে ওই কর্মকর্তা আট হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। এর কিছু সময় পর জরুরি টাকার দরকার জানিয়ে একটি বিকাশ নম্বর দেন তিনি। সে সময় তিনি সাত হাজার টাকা দিতে বলেন এবং টাকা পেলে বিকালের মধ্যে প্রতিবেদন পরিবর্তন করে দেওয়ার আশ্বাস দেন।
এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে জানতে শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম সাইফুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘুষ দাবির বিষয়টি অস্বীকার করেন। তার দাবি, তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটি হ্যাক হয়েছে এবং পরিচিত বেশ কয়েকজনের কাছে এভাবেই টাকা চেয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়েছে।
ঘুষ দাবির এই চাঞ্চল্যকর বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা শিক্ষা অফিসার মো. মাহফুজুল হোসেন। তিনি বলেন, বিষয়টি এখনো আমার জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


