বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে শুক্রবার মুখোমুখি হচ্ছে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। এই ম্যাচে ইতিহাস গড়বেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদ্রিচ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম ৪০ বছর বয়সী দুই আউটফিল্ড খেলোয়াড় একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছেন।
তবে এই দুই কিংবদন্তিকে নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে। দেশের জার্সিতে তাদের মহাতারকা ইমেজ দলের শেষ ষোলোয় ওঠার পথে বড় শক্তি নাকি উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
এই টুর্নামেন্টের আগে একমাত্র আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে ৪০ বছর বয়সে বিশ্বকাপ খেলেছিলেন ক্যামেরুনের রজার মিলা।
রিয়াল মাদ্রিদে একসঙ্গে ছয় মৌসুমে চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন রোনালদো ও মদ্রিচ। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখালেও, বিশ্বমঞ্চের এই শেষ অধ্যায়ে এসে তাদের খেলায় বয়সের ছাপ স্পষ্ট।
৪১ বছর বয়সী রোনালদো উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়েন। ম্যাচ শেষে হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ‘আমি ফিরে এসেছি’।
তবে র্যাংকিংয়ের ৬০ নম্বরে থাকা দলের বিপক্ষে ৫-০ গোলের বড় জয় পেলেও, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ও কলম্বিয়ার সঙ্গে ড্র করে পর্তুগাল। ফলে নকআউট পর্বে কঠিন গ্রুপে পড়তে হয়েছে তাদের।
রোনালদো টুর্নামেন্টের শুরুতে বলেছিলেন, ‘২৩ বছর ধরে পেশাদার ফুটবল খেলছি। যখনই পারফরম্যান্স খারাপ হয়, সবাই বলে ক্রিশ্চিয়ানো শেষ, ও বুড়ো হয়ে গেছে।’
গ্রুপ পর্বের প্রতি মিনিটে মাঠে ছিলেন এই ফরোয়ার্ড। বিদায়ী পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ীকে বেঞ্চে বসানোর কোনো লক্ষণই দেখাননি। কলম্বিয়ার বক্সে রোনালদো মাত্র দুবার বল ছোঁয়ার পরও মার্তিনেজ বলেন, ‘আজকের ফুটবলে ৯০ মিনিট খেলার মতো শারীরিক ও মানসিক ঘাটতি ক্রিশ্চিয়ানোর নেই।’
চার বছর আগের বিশ্বকাপে বাজে শুরুর পর তৎকালীন কোচ ফের্নান্দো সান্তোস রোনালদোকে বাদ দিয়ে গনসালো রামোসকে নামিয়েছিলেন। এসি মিলানের এই স্ট্রাইকার সুইজারল্যান্ডকে ৬-১ গোলে ওড়ানোর ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কাছে ১-০ গোলে হেরে পর্তুগাল বিদায় নিলে রোনালদোর ফেরার পথ তৈরি হয়, চাকরি হারান সান্তোস।
অনেকের মতে, রোনালদোর অহমিকা টিকিয়ে রাখতে মার্তিনেজ পর্তুগালের একঝাঁক প্রতিভাবান প্রজন্মকে নষ্ট করছেন। দলটির মন্থর পারফরম্যান্সে এই ধারণা আরও জোরালো হচ্ছে।
পর্তুগালের মাঝমাঠের গভীরতা এতটাই যে, কলম্বিয়ার বিপক্ষে পিএসজির জোয়াও নেভেস ও রিয়াল মাদ্রিদের বের্নার্দো সিলভাকে বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছে। অথচ এত শক্তিশালী মাঝমাঠ পেছনে থাকার পরও, বড় টুর্নামেন্টে খেলা শেষ ১৪ ম্যাচে পেনাল্টি ছাড়া রোনালদোর গোল মাত্র ওই দুটি। এটি এসেছে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে।
ডালাসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রোয়েশিয়ার প্রথম ম্যাচেই ৪০ বছর বয়সী মদ্রিচের খেলায় ক্লান্তির ছাপ দেখা গেছে। সেই ম্যাচে ক্রোয়েশিয়া হারে ৪-২ গোলে। বক্সের ভেতর ননি মাদুয়েকেকে ফাউল করে ইংল্যান্ডকে পেনাল্টি উপহার দেন মদ্রিচ। ম্যাচের এক ঘণ্টা হওয়ার আগেই তাকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ জলাতকো দালিচ।
তবে পানামার বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ে ঘুরে দাঁড়ায় ক্রোয়েশিয়া। ম্যাচটি ছিল মদ্রিচের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। রোনালদোর পর চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে আন্তর্জাতিক ম্যাচে দ্বিশতক ছোঁয়ার কীর্তি গড়েন তিনি।
ঘানার বিপক্ষে ২-১ গোলে জয়ের ম্যাচে এসি মিলানের এই মিডফিল্ডারের পাস থেকেই জয়সূচক গোলটি করেন নিকোলা ভ্লাসিচ।
২০১৮ সালের রানার্সআপ ক্রোয়েশিয়া চার বছর আগের বিশ্বকাপেও সেমিফাইনালে খেলেছিল। ৪০ লাখেরও কম জনসংখ্যার এই দেশের অবিশ্বাস্য সাফল্যের মূল কারিগর ছিলেন মদ্রিচ।
টরন্টোয় শুক্রবারের জয়ী দলের জন্য অপেক্ষা করছে শেষ ১৬-তে স্পেনের সঙ্গে সম্ভাব্য লড়াই ও ট্রফি জয়ের শেষ সুযোগ। তবে ফুটবল ইতিহাসের এই দুই মহানায়কের যেকোনো একজনের বিশ্বকাপের পথচলা এবার কানাডাতেই থমকে যাবে।


