ডিজিটাল ব্যাংকের পতন/ ফৌজদারি তদন্তের মুখে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট

ফৌজদারি তদন্তের মুখে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট
প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়া। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

বড় একটি ডিজিটাল ব্যাংকের পতনের ঘটনায় ফৌজদারি তদন্তের মুখে পড়েছেন প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়া। শুক্রবার দেশটির সিনেটে অভিশংসন ও সম্ভাব্য পদচ্যুতির মুখে নিজের অবস্থান তুলে ধরার ঘোষণা দিতে না দিতেই তার বিরুদ্ধে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির আইনপ্রণেতারা।

সম্প্রতি প্যারাগুয়ের অন্যতম বড় ডিজিটাল ব্যাংক উয়েনোর পতনে প্রেসিডেন্ট পেনিয়াকে দায়ী করছেন গ্রাহকরা। এই সংকট পেনিয়ার দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন দল কলোরাডো পার্টিকেও তার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে।

ডিজিটাল ব্যাংক হলো এমন একটি ব্যাংক, যেখানে গ্রাহকের অধিকাংশ ব্যাংকিং কার্যক্রম সরাসরি শাখায় না গিয়ে মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ, সাধারণ ব্যাংকে টাকা জমা রাখা, তোলা, পাঠানো বা হিসাব খোলার জন্য অনেক সময় শাখায় যেতে হয়। কিন্তু ডিজিটাল ব্যাংকে এসব কাজ মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে করা যায়।

বার্তাসংস্থা এপির খবরে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক এই অর্থনীতিবিদ একসময় দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিকদের সমর্থন ভোগ করতেন। কয়েক সপ্তাহ আগেও তাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে ওয়াশিংটনে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকটির পতন সেই রাজনৈতিক অবস্থান আমূল বদলে দিয়েছে।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার একের পর এক রাজনৈতিক পরিবর্তনে পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় পদত্যাগের প্রস্তাব দেন পেনিয়া। এর কয়েক মুহূর্ত পরই দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ সর্বসম্মতিক্রমে তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেয়।

তবে সংসদের উভয় কক্ষই তার পদত্যাগের প্রস্তাব গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। এর পরিবর্তে সিনেট পেনিয়ার বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যার পরিণতি হতে পারে প্রেসিডেন্ট থেকে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা।

প্যারাগুয়ের বিরোধী দলের সিনেটররা পেনিয়াকে পদচ্যুত করার দাবিতে অনড় রয়েছেন। তাদের দাবি, পেনিয়াকে নিজ থেকে পদত্যাগের সুযোগ দিলে তিনি আজীবন সিনেটর হওয়ার যোগ্যতা ধরে রাখতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে তিনি আজীবন সিনেটর হিসেবে আইনি সুরক্ষা পাবেন, যা তার বিরুদ্ধে মামলা বা বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে পারে। প্যারাগুয়ের অ্যাটর্নি জেনারেল এমিলিয়ানো রোলোন ফার্নান্দেস অভিযোগ গঠনের সিদ্ধান্ত নিলে এই আইনি সুরক্ষাও বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

বৃহস্পতিবার উয়েনো ব্যাংকের ইউনিফর্ম পরা তরুণ কর্মীরাও শ্রম মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন। তারা নিজেদের ব্যাংক কার্ড পুড়িয়ে পেনিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। চাকরি হারানোর ক্ষতিপূরণ ও বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে তাদের এই বিক্ষোভ চলে। এমনকি পেনিয়ার পদত্যাগের ঘোষণাতেও তাদের ক্ষোভ কমেনি।

এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘অভিশংসন প্রক্রিয়া চলতে দিন এবং তার দায়মুক্তি কেড়ে নেওয়া হোক।’

Paraguay-Ueno-Bank-1
সরকার ও উয়েনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময় প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনার ছবি সংবলিত যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের আদলে তৈরি একটি নকল নোট হাতে এক বিক্ষোভকারী। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

দেশটির আইনপ্রণেতাদের কার্যালয় বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, উয়েনো ব্যাংকের সংকট নিয়ে তিনটি ফৌজদারি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন রোলোন। এর মধ্যে পেনিয়া এবং বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।

তদন্তে ব্যাংকটির ওপর কর্তৃপক্ষের নজরদারি, ব্যাংকটির পতন মোকাবিলায় তাদের ভূমিকা এবং সরকারি অর্থ এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রাখার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।

অবশ্য তদন্তকারীদের পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পেনিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, ‘এই প্রক্রিয়ার পরিণতি যা-ই হোক না কেন, আমি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এবং সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কাজ করব।’

আরও পড়ুন

এর আগে বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় পেনিয়া বলেছিলেন, দেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক শান্তি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষার প্রয়োজনেই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

গত বছর পর্যন্ত উয়েনো ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানে তার মালিকানাধীন অংশীদার ছিল। ব্যাংকটির পতনের ঘটনায় অনুতাপ প্রকাশ করলেও সৃষ্ট অস্থিরতার দায় সরাসরি স্বীকার করেননি তিনি। ব্যাংকটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ আমানতকারী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও কর্মী তাদের আটকে পড়া সঞ্চয় এবং বকেয়া বেতন ফেরত পেতে হিমশিম খাচ্ছেন।

পেনিয়াকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা তার স্থলাভিষিক্ত হবেন।

পেনিয়া বলেন, ‘কোনো পর্যায়ে আমি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়ে থাকলে তাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। তারা আমার ওপর যে আস্থা রেখেছিলেন, তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা কখনোই আমার উদ্দেশ্য ছিল না।’

২০২৩ সালে ব্যাংকিং কার্যক্রমের অনুমতি পাওয়ার পর উয়েনো ব্যাংক প্যারাগুয়েতে দ্রুত পরিচিতি লাভ করে। একসময় অখ্যাত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র পাঁচ বছরের কম সময়ে এটি দেশটির অন্যতম পরিচিত ব্যাংকে পরিণত হয়।

কয়েক দশকের পুরোনো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নতুন নামে ডিজিটাল ব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলা হয়। মুদি পণ্য কেনাকাটায় আকর্ষণীয় নগদ অর্থ ফেরতের সুবিধা দিয়ে গ্রাহক টানতে শুরু করে ব্যাংকটি। একপর্যায়ে দেশজুড়ে তাদের ৭০টির বেশি শাখা গড়ে ওঠে। প্যারাগুয়ের জাতীয় ফুটবল দলকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার পাশাপাশি দেশের প্রধান স্টেডিয়ামেও ব্যাংকটির নাম বড় করে প্রদর্শন করা হয়। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ব্যাংক কীভাবে ঋণ বিতরণ নিয়ে বারবার সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও এত দ্রুত আকার ও প্রভাব বিস্তার করল, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন প্যারাগুয়ের অসংখ্য নাগরিক।

ব্যাংকটির দাবি, প্যারাগুয়ের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বেশি তাদের গ্রাহক। পেনিয়ার শাসনামলে সরকারি অর্থও বিপুল পরিমাণে উয়েনো ব্যাংকে জমা হতে থাকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে দেশটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যবসায়ী অভিজাতদের সঙ্গে পেনিয়ার কলোরাডো পার্টির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিকতা এবং দ্রুত প্রবৃদ্ধির কারণে সম্প্রতি প্যারাগুয়ে বিনিয়োগযোগ্য ঋণমান অর্জন করলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ক্ষমতাসীন দলের মধ্যকার এই ঘনিষ্ঠতা থেকে সৃষ্ট দুর্বলতা দূর হয়নি।

Paraguay-Ueno-Bank
উয়েনো ব্যাংক। ছবি: এপি/ইউএনবি

 

এদিকে ব্যাংকটির পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠান ফিনানসিয়েরা উয়েনোর প্রেসিডেন্ট কার্লোস কারভালহোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন পেনিয়া। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই দায়িত্ব ছিল ডিজিটাল ব্যাংকটির কার্যক্রম তদারক করা।

বুধবার কংগ্রেসের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়া এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘সান্তিয়াগো পেনিয়া ও কলোরাডো পার্টি আমাদের সব সঞ্চয় চুরি করেছে। ৭০ বছরের লুটপাটে আমরা অতিষ্ঠ।’

গত মাসের হিসাব অনুযায়ী, উয়েনো ব্যাংকে প্রায় ৮০ কোটি ডলারের সরকারি আমানত ছিল, যা ব্যাংকটির মোট আমানতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় পেনশন ও স্বাস্থ্য তহবিল এবং প্যারাগুয়ের বিশাল জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জমা রাখা অর্থও ছিল।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে ব্যাংকটি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছিল। প্যারাগুয়ের প্রভাবশালী সংবাদপত্র এবিসি কলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকেরা ব্যাংকটির ঋণ বিতরণে ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা খুঁজে পান। ব্যাংকটির মালিকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয়েছিল, যা আইন নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি। ঋণ খেলাপি হলে তা আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত জামানতও নেওয়া হয়নি।

এমনকি গত মাসেও পেনিয়া উয়েনো ব্যাংক এবং এর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন। তিনি এ নিয়ে উদ্বেগকে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেন।

কিন্তু সোমবার পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, উয়েনো ব্যাংকের মালিকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া ঋণের তদন্তে দেখা গেছে, অনেক ঋণের নথিপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। পাশাপাশি ব্যাংকটি কিছু ব্যয়কে ভুলভাবে সম্পদ হিসেবে হিসাবভুক্ত করেছিল।

হিসাব সংশোধনের পর লোকসান সামাল দিতে ব্যাংকগুলোর যে ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক, উয়েনো ব্যাংকের মূলধন তার অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসে।

মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। এর পর আমানত ও আদায়যোগ্য সম্পদ অন্য ব্যাংকগুলোর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। অবশিষ্ট সম্পদ বিক্রি করে ব্যাংকটির কার্যক্রম চূড়ান্তভাবে বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এর ফলে উয়েনো ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ, কার্ড ও অর্থ স্থানান্তরসেবা বন্ধ হয়ে যায়। শাখাগুলোর দরজাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে দিশেহারা আমানতকারীরা নিজেদের টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় ব্যাংকের বাইরে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হন। বুধবার অন্য ব্যাংকে নতুন হিসাব খোলার জন্য গ্রাহকদের হুড়োহুড়ি শুরু হলে সেসব ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপও অচল হয়ে পড়ে। এতে জনমনে আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সেদিনই তড়িঘড়ি করে কংগ্রেসে পাস করা একটি আইনের আওতায় রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি তহবিল থেকে আটকে পড়া আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়। বৃহস্পতিবার থেকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধ শুরু করার কথা।

এদিকে বৃহস্পতিবার আদালতের নির্দেশে উয়েনো ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তাকে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা মিগেল ভাসকেস এবং প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল গুস্তালে। অন্য দুজনকে গৃহবন্দি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকটির ২৭ জন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গ এবং প্রতারণার চেষ্টার অভিযোগ এনেছেন আইনপ্রণেতারা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad