শ্রেণিকক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের বিষয়ে স্কুলগুলোর মধ্যে বিতর্ক চলছে। এর মধ্যেই শিক্ষার্থীদের জন্য এআই সুবিধা চালু করে সমালোচনার মুখে পড়ে গুগল। এবার স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজে থেকে চালু না করা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্টে এআই টুলগুলো বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি।
যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, দেশটির স্কুলগুলোতে প্রযুক্তি খাতে গুগলের ব্যাপক আধিপত্য রয়েছে। অনেক স্কুলের শ্রেণিকক্ষে জিমেইল, ডকস ও ক্লাসরুমের মতো গুগলের শিক্ষাবিষয়ক অ্যাপ ব্যবহার করা হয়। শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য স্কুলগুলো সবচেয়ে বেশি সরবরাহ করে কম দামের ক্রোমবুক ল্যাপটপ।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক ব্লগ পোস্টে গুগল জানায়, কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত (কে-১২) শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্টে জেমিনি, জেমিনি নোটবুক, ক্লাসরুমে জেমিনি ও সার্চের এআই টুলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ থাকবে। স্কুল কর্তৃপক্ষ চাইলে পরে এগুলো চালু করতে পারবে।
গুগল এএফপিকে জানিয়েছে, নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রে চালু হবে। পরে তা বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণ করা হবে। তবে এ বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানানো হয়নি।
তবে নতুন ব্যবস্থায় স্কুলগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য এআই সুবিধা ছাড়া গুগল সার্চ ব্যবহারের সুযোগ দিতে পারবে না।
গুগলের শিক্ষাবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্রিস ফিলিপস নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, সার্চ ও এআই এখন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ, গুগলের সার্চ ইঞ্জিনের মধ্যেই এআই ফিচার যুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো স্কুল এআই নিষিদ্ধ করলে শিক্ষার্থীরা সার্চও ব্যবহার করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে সার্চ পাওয়া যাচ্ছে না বলে স্কুলের পক্ষ থেকে একটি বার্তা দেখানো হবে।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে গুগলের সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, সরকারি স্কুলগুলোতে এআই চাপিয়ে দিতে নিজেদের একচেটিয়া ক্ষমতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে গুগল।
তার ভাষায়, ‘আমাদের শিশুদের কীভাবে শিক্ষা দেওয়া হবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের থাকা উচিত নয়।’
গত মাসে সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল ও জোশ হওলি বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানান, বিশ্বজুড়ে ১৫ কোটির বেশি শিক্ষার্থী গুগল ক্লাসরুম ব্যবহার করে। স্কুলের ডিভাইসগুলোতে এআই ফিচার কেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু রাখা হয়েছিল, চিঠিতে সে প্রশ্ন তোলা হয়।
গত আগস্টে সব বয়সী শিক্ষার্থীর জন্য ক্লাসরুমে জেমিনি চ্যাটবট চালু করেছিল গুগল। তখন শিক্ষার্থীদের সামনে শ্রেণি ও অ্যাসাইনমেন্টভিত্তিক কিছু প্রাথমিক প্রম্পট দেখানো হতো। সেগুলোর মাধ্যমে তারা নির্দেশনা অনুযায়ী সহায়তা ও পড়াশোনার গাইড পেত। কোর্সের উপকরণ থেকে তৈরি অনুশীলন কুইজ ও ফ্ল্যাশকার্ডও ব্যবহার করতে পারত।
যেসব স্কুল আগে থেকেই জেমিনি চালু করেছিল, সেসব স্কুলের শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্টে ফিচারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু ছিল।
স্কুলের ডিভাইসে এআই টুলের ব্যবহার সীমিত করার পরিকল্পনার কথা গত সেপ্টেম্বরে ঘোষণা করেছিল নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেস। লস অ্যাঞ্জেলেস ইউনিফাইড স্কুল ডিস্ট্রিক্টের এক মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, গুগলের ঘোষণা এবং স্কুল, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মুখপাত্রের ভাষ্য, সতর্কতার সঙ্গে এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করে ব্যবহার করা হলে এআই শিক্ষাদান ও শেখার প্রক্রিয়াকে উন্নত করতে পারে। তবে প্রযুক্তি যেন শিক্ষকদের জায়গা দখল না করে, বরং তাদের কাজে সহায়তা করে এবং শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তা রক্ষা করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক স্কুলসও (এনওয়াইসিপিএস) নতুন নীতি সম্পর্কে গুগলের কাছে বিস্তারিত জানতে চেয়েছে বলে ডিস্ট্রিক্টের এক মুখপাত্র এএফপিকে জানিয়েছেন। তবে নিউইয়র্কের সরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত ক্রোমবুকে জেমিনি চ্যাটবট ও এআই মোড ইতোমধ্যেই বন্ধ রয়েছে।
ওই মুখপাত্র বলেন, গুগল সার্চের ফলাফলে শিক্ষার্থীদের জন্য দেখানো এআই ওভারভিউ বন্ধ করতেও এনওয়াইসিপিএস প্রতিষ্ঠানটিকে অনুরোধ জানিয়েছে।
মঙ্গলবার এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে গুগল বলেছে, নতুন পরিবর্তনগুলো স্কুলগুলোর সামনে পছন্দের সুযোগ কমাবে না, বরং বাড়াবে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় শর্টকাট নিতে এআই ব্যবহার করছে কি না, তা নিয়ে স্কুলগুলোর উদ্বেগ রয়েছে। স্কুলগুলো আগেই গুগলকে জানিয়েছিল, এআই ব্যবহারের ওপর তারা নিয়ন্ত্রণ চায়।


