দেশের ব্যাংকগুলোর বাণিজ্যিক অর্থায়ন এবং বড় ব্যবসায়িক ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে ‘একক ঋণগ্রহীতা সীমা’ সংক্রান্ত নিয়মে শিথিলতা এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে আমদান-রপ্তানি এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো এখন আগের চেয়ে বেশি সহায়তা দিতে পারবে।
গত বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা একটি সার্কুলারে জানানো হয়েছে, কোনো একক ঋণগ্রহীতা, প্রতিপক্ষ বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর জন্য ঋণের ঊর্ধ্বসীমা ব্যাংকের মূলধনের ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। এই নতুন নিয়ম ২০২৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলো এলসি (ঋণপত্র) খোলা এবং গ্যারান্টি প্রদানসহ বাণিজ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অতিরিক্ত অর্থায়ন করার সুযোগ পাবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক অস্থায়ীভাবে ‘নন-ফান্ডেড’ বা পরোক্ষ ঋণের হিসাব পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এনেছে। এক্ষেত্রে কনভারশন ফ্যাক্টর বা রূপান্তর হার ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। এর সহজ অর্থ হলো, এলসি বা গ্যারান্টির মতো বিষয়গুলো এখন থেকে ঋণসীমা গণনার সময় আগের চেয়ে কম পরিমাণে হিসাবে ধরা হবে।
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই শিথিলতার ফলে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটে ঋণ দেওয়ার জন্য বাড়তি জায়গা তৈরি হবে। এতে করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন না করেই ব্যাংকগুলো বড় ধরনের বাণিজ্যিক লেনদেনে অর্থায়ন করতে পারবে। তারা আরও জানান, অনেক ব্যাংকই বড় করপোরেট গ্রুপগুলোর আমদানিসহ বাণিজ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন দায় মেটানোর ক্ষেত্রে নির্ধারিত ঋণসীমার একদম কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।
সার্কুলার অনুযায়ী, নন-ফান্ডেড ঋণের হিসাবের এই সুবিধা ২০২৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত বহাল থাকবে। এরপর এই রূপান্তর হার ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। ২০২৭ সাল শেষে এটি ৩০ শতাংশ, ২০২৮ সাল শেষে ৪০ শতাংশ এবং ২০২৯ সাল শেষে ৫০ শতাংশে উন্নীত হবে। সবশেষে ২০৩০ সালের জানুয়ারি থেকে এটি পুনরায় আগের মূল নিয়মে ফিরে যাবে।
পাশাপাশি বড় অংকের ঋণ প্রদানের কাঠামোর ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন থেকে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা তাদের খেলাপি ঋণের হারের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম, তারা বড় অংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সুযোগ পাবে। অন্যদিকে যাদের সম্পদের গুণগত মান দুর্বল বা খেলাপি ঋণ বেশি, তাদের জন্য ঋণের সীমা সংকুচিত করা হবে।
উদাহরণস্বরূপ, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের মধ্যে, তারা মোট ঋণের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বড় ঋণ হিসেবে দিতে পারবে। তবে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশের বেশি, তাদের ক্ষেত্রে এই সীমা ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগের ফলে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে এবং অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো আরও নমনীয় হতে পারবে। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, বড় ব্যবসায়িক গ্রুপগুলোর হাতে ঋণ কেন্দ্রীয়ভূত হয়ে পড়লে ঝুঁকির মাত্রাও কিছুটা বেড়ে যেতে পারে।


