মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার পানিশাইল গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা বিকাশ চন্দ্র সরকার। তিনি শুধু একজন কৃষকই নন, বরং অন্যদের কাছে অনুপ্রেরণার আরেক নাম।
২০১৬ সাল থেকেই বাবার সঙ্গে প্রচলিত কৃষিকাজে যুক্ত হন বিকাশ। সে সময় ক্রমাগত ফসলের ক্ষতি, দাম না পাওয়া, কীটনাশকের ঝুঁকি, এ সবকিছু মিলিয়ে হতাশা পেয়ে বসেছিল তাকে। তাতে মনোবল হারাননি তিনি। করোনাকালে ঘরে বসেই ইউটিউব ভিডিও দেখতে গিয়ে তিনি পলিশেড হাউজে প্লাস্টিক ট্রেতে সবজির চারা উৎপাদন কৌশল খুঁজে পান। পরীক্ষামূলকভাবে বাড়ির পাশে ছোট্ট একটি শেডে মাত্র ১০ হাজার চারা উৎপাদন করেন। প্রথমবারেই সফলতা পান। আর সেই সাফল্যই বদলে দেয় তার জীবনের পথচলা।
এখন এক বিঘা জমিতে দাঁড়িয়ে আছে তার তিনটি আধুনিক পলিশেড হাউজ বা প্লস্টিকের শিট দিয়ে তৈরি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ফসল তৈরির কাঠামো। সেখানে সারিবদ্ধভাবে সাজানো প্লাস্টিক ট্রেতে সবুজ চারার সারি। দেখে মনে হয় যেন এক টুকরো জীবন্ত শিল্পকর্ম। এসব খামারেই ব্যস্ত সময় পার করছেন আট থেকে ১০ জন স্থানীয় নারী-পুরুষ। যাদের অনেকেই আগে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
খামারে তারা কেউ এখন বীজ বপনে ব্যস্ত, কেউ চারায় পানি দিচ্ছেন, আবার কেউ বাজারে পাঠানোর জন্য ক্যারেটে চারা গোছাচ্ছেন পরম যত্নে। বিকাশ নিজেও এখানে শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করেন।

তিনি জানান, ‘করোনার সময় ইউটিউবে দেখেই শুরু করেছিলাম। তখন ভাবিনি এত দূর যেতে পারব। এখন এক মৌসুমে সব খরচ বাদে অন্তত ছয় লাখ টাকা লাভ হয়। শুধু নিজের আয় নয়, আমার সঙ্গে কাজ করে গ্রামের আরও অনেকে উপকৃত হচ্ছেন।’ ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে খামারে চারা উৎপাদন করার ইচ্ছা এই আধুনিক কৃষকের।
প্রথমে ছেলের উদ্যোগে খুব একটা ভরসা পাননি বাবা রঞ্জিত চন্দ্র সরকার। কিন্তু সাফল্যের পর তিনিও এখন নিয়মিত খামারে কাজ করেন। রঞ্জিত চন্দ্র বলেন, ‘প্রথমে ভাবতাম ছেলের এ কাজে লাভ হবে না। কিন্তু এখন দেখছি, সে শুধু নিজের নয়, গ্রামেরও মুখ উজ্জ্বল করছে। কৃষি অফিস থেকেও নানা সহায়তা পাচ্ছি।’
স্থানীয় কৃষক শহীদ হোসেন বলেন, ‘আগে অন্য জায়গা থেকে চারা আনতে হতো, অনেক সময় দুর্বল হয়ে যেত। বিকাশের চারা শক্ত, ফলনও ভালো হয়। এখন আর বাইরে যেতে হয় না।’
শুধু সিংগাইর নয়, আশপাশের সাভার, দোহার, কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জের কৃষকরাও এখন বিকাশের কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করেন।
আগে যশোর থেকে চারা কিনতেন কেরানীগঞ্জের কৃষক আনোয়ার। তাতে নষ্ট হতো অনেক চারা। তিনি বলেন, ‘এখন বিকাশের কাছ থেকে নিচ্ছি। মান ভালো, খরচও কম।’
বিকাশের খামারে কর্মরত শ্রমিক মফিজুল বলেন, ‘সারা বছরই কাজ থাকে, তবে শীত মৌসুমে চাহিদা বেশি থাকে। ব্রকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি আর টমেটোর চারা তখন বিক্রি হয় সবচেয়ে বেশি। আগে বাইরে কাজ খুঁজতে হতো। এখন এখানেই মাসিক বেতনে কাজ করি, সংসার ভালোই চলছে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল বাশার চৌধুরী জানান, পলিশেড হাউজে চারা উৎপাদনে খরচ ও ঝুঁকি কম, উৎপাদন হয় মানসম্মত। শেডের বিশেষ প্লাস্টিক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখে, ফলে রোগবালাইয়ের আশঙ্কা কমে।
তিনি বলেন, ‘বিকাশের মানসম্মত চারা এখন শুধু স্থানীয় নয়, আশপাশের জেলার কৃষকরাও নিচ্ছেন। তার উদ্যোগে সিংগাইরে গাছের চারা উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। তাকে আমাদের পক্ষ থেকে একটি পলিশেড হাউজ নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে এবং নানা বিষয়ে সব সময়ই তাকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
বিকাশ চন্দ্র সরকারের সাফল্যে শুধু তার পরিবার নয়, পুরো গ্রামের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নিজ হাতে গড়া পলিশেড হাউজ গ্রামের তরুণদের চোখে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।


