আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমজীবনের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন গুমের মামলায় প্রসিকিউশনের সাক্ষী ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান।
তার অভিযোগ, গোপন বন্দিদশায় থাকার সময় তিনি বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে কোরআন শরিফ চাইলেও তাকে দেওয়া হয়নি।
বুধবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই)-এ সংঘটিত গুমের মামলার শুনানিতে এসব কথা বলেন তিনি।
আরমান বলেন, ‘রমজান মাসে আমি অনেকবার কোরআন শরিফ চেয়েছিলাম। তারা আমাকে নিয়মের দোহাই দিয়ে সেটি দেয়নি। পরে এক প্রহরী বলেন, “আমরা মুসলমান কোরআন শরিফ দিতে চাই। কিন্তু র এর যে অফিসার আছে, তার কারণে দিতে পারছি না”।’
এই মামলায় আসামি করা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীসহ বর্তমান ও সাবেক সামরিক এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের।
৪১ বছর বয়সী ব্যারিস্টার আরমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী। তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মীর কাসেম আলীর ছেলে।
তিনি বলেন, ‘আমার পিতা মীর কাসেম আলীর মামলায় আমি আইনজীবী ছিলাম। ট্রাইব্যুনালে তার ফাঁসির রায় হয়েছিল। আপিল বিভাগে আপিল খারিজ হয়, রিভিউ শুনানি চলছিল।’
নিজের গুম হওয়ার বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের ৯ আগস্ট রাতে আমাকে বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে অপহরণ করা হয়।‘
প্রথম বন্দিশালার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, `আমাকে একটি সংকীর্ণ সেলে নেওয়া হয়। জামা-কাপড় খুলে তাদের দেওয়া লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরতে বলা হয়। মেঝে স্যাঁতসেতে ছিল, ইঁদুর ও তেলাপোকা আমার শরীরের উপর দিয়ে চলাফেরা করছিল।‘
আরমান ভেবেছিলেন, তাকে হয়ত সেখানে ২৪ ঘণ্টার বেশি থাকতে হবে না, কিন্তু এক সপ্তাহ পার হলেও তাকে আদালতে হাজির করা হয়নি।
তিনি জবানবন্দিতে বলেন, ‘আমি বুঝতে পারলাম, একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে যে গুমের বিরুদ্ধে আমি কথা বলতাম, আমি নিজেই সেই গুমের শিকার হয়েছি। সেখানে আমাকে ১৬ দিন রাখা হয় এবং এই ১৬ দিনে বেশ কয়েকবার প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ি।’
পরবর্তীতে তাকে আরেকটি বন্দিশালায় নেওয়ার কথাও বর্ণনা করেন ব্যারিস্টার আরমান।
তিনি বলেন, নতুন সেলটি আগের চেয়ে বড় ছিল, ফ্লোর টাইলস করা, এটাস্ট টয়লেটসহ। টাইলসের রং, সিঁড়ির সংখ্যা এবং দরজার ধরন পর্যন্ত তিনি আদালতে বর্ণনা করেন।
নির্যাতন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাকে সার্বক্ষণিক চোখ বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে রাখা হত।খাবারের সময় ডান হাত, টয়লেটের সময় বাম হাত খুলে দিত। গভীর রাতে দুই হাত পেছনে নিয়ে হাতকড়া পরানো হত এবং সকাল পর্যন্ত তা খোলা হতো না।’
চিকিৎসার প্রসঙ্গে প্রসিকিউশনের এই প্রথম সাক্ষী বলেন, ‘আমি প্রায়ই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তাম। তখন বাইরে থেকে চিকিৎসক এসে চিকিৎসা দিত। ডান উরুতে ফোঁড়া হওয়ার পর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নিয়ে মাইনর সার্জারি করা হয়।’
একদিন ওষুধ দেওয়ার সময় তিনি লক্ষ্য করেন, একটি কাঠের বাক্সে লেখা ছিল ‘টিএফআই’, এবং ওষুধের ঠোঙ্গায় লেখা ছিল ‘ভিআইপি-২।’ গরমের সময় হিটস্ট্রোক হলে কয়েক দিনের জন্য একটি স্ট্যান্ড ফ্যান দেওয়া হয়েছিল, যার নিচে লেখা ছিল র্যাব-১, জানান তিনি।
তিন বেলা খাবার দেওয়া হলেও তার পরিমাণ খুব কম ছিল বলে জানান ব্যারিস্টার আরমান।
তিনি বলেন, ‘মুক্তির কয়েক মাস আগে থেকে খাবার খাওয়ার পর সারা শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হতো। মনে হতো হাজারটি পিঁপড়া আমাকে কামড়াচ্ছে। প্লেটে পানি ঢাললে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মত বুদবুদ উঠতে দেখি। তাতে সন্দেহ করি, আমার খাবারে কিছু মেশানো হচ্ছিল।’
রমজান মাসকে তিনি সময় গণনার একমাত্র উপায় হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।
‘রমজান এলে তারা আমাকে জানাত। এভাবে হিসাব করে দেখি, আমি আটটি রমজান ওখানে ছিলাম। প্রথম রমজানের পর প্রচণ্ড খিঁচুনি হলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সেলে আসেন। তখন আমি আবার কোরআন শরিফ চাই। তখন আমাকে কোরআন শরিফ দেওয়া হয়।’


