বরগুনায় যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী মহিমা বেগমকে হত্যা মামলায় স্বামী, সতিন ও মেয়ের জামাইকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডও করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ বেগম লায়লাতুল ফেরদৌস এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় তিন আসামিই আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন–পাথরঘাটা উপজেলার রায়হানপুর ইউনিয়নের কবির তালুকদার (৫৯), তার দ্বিতীয় স্ত্রী এলাচী বেগম (৫০) ও মৃতের মেয়ে জামাই সুজন।
প্রধান অভিযুক্ত দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কবির তালুকদার এবং মৃত মহিমা বেগমের ছেলে মামলার বাদী হেলাল তালুকদার। তিনি বলেন, ‘আমি আমার মায়ের হত্যাকারীদের ফাঁসির রায়ে সন্তুষ্ট। আদালতের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমি আইনকে শ্রদ্ধা জানাই।’
আসামিদের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম তরু ফরাজী। তিনি বলেন, ‘আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।’
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর ( বিশেষ পিপি) হোসনেয়ারা শিপু বলেন, ‘আসামিরা পরিকল্পিতভাবে ভুক্তভোগীকে হত্যা করেছেন। আদালতে সাক্ষীদের জবানবন্দি প্রমাণিত হওয়ায় বিচারক তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে।’
মামলার এজাহারে বলা হয়, বাদী হেলাল তালুকদারের মা মহিমা বেগমকে বাবা কবির তালুকদার ৩০ বছর আগে বিয়ে করেন। বৈবাহিক জীবনে বাদীর বাবা যৌতুকের দাবিতে প্রায়ই তার মাকে নির্যাতন করতেন। এ ছাড়া তার ছোট বোনের শাশুড়ি আসামি এলাচি বেগমের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক ছিল।
বাদীর বোন রেখা বেগম তার বাবা ও শাশুড়িকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে প্রতিবাদ করায় শাশুড়ি এলাচী বেগম ও স্বামী সুজন তার ওপর নির্যাতন চালানো শুরু করে। তাদের নির্যাতন সইতে না পেরে বোন রেখা বেগম রাগে ক্ষোভে আত্মহত্যা করেন। রেখা বেগমের মৃত্যুর তিন থেকে চার বছর পর কবির তালুকদার তার মায়ের (মহিমা বেগম) অমতে বোনের শাশুড়ি এলাচি বেগমকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তাদের বিয়ে না মানায় মহিমা বেগমকে যৌতুকের জন্য চাপ দিতে থাকে এবং নির্যাতন চালাতে শুরু করেন।
একপর্যায়ে বাদীর মা আত্মহত্যা করার জন্য বিষপান করেন। পরবর্তীতে চিকিৎসায় বেঁচে গেলেও আসামিরা ভুক্তভোগীতে হত্যার জন্য পরিকল্পনা করতে থাকেন। ২০১৯ সালের ২৫ অক্টোবর ঘটনার দিন সকালে আসামি কবির তালুকদার বাদী হেলাল তালুকদারকে বলেন ‘তোর শ্বশুর অসুস্থ, তুই তাড়াতাড়ি যা’। বাদী শ্বশুরবাড়ি কালমেঘায় স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে যাওয়ার পর দেখতে পান শ্বশুর সুস্থ আছে এবং তিনি তার বাবা কবির তালুকদারকে কোনো কল করেননি।
মামলায় বাদী আরও বলেন, ‘আমি শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ার পর ওইদিন দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে আমার মাকে তার বাবার বাড়ির সম্পতি বিক্রি করার জন্য চাপ দিতে থাকে। আমার মা রাজি না হওয়ায় আসামিরা আমার মার ডান হাতের তিনটি আঙুল, পিঠে ও বুকে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে হত্যা করেন। হত্যা নিশ্চিত হওয়ার পর আসামিরা চিৎকার করে বলেন, আমার মার শক লেগেছে। আমি এই খবর শুনে এসে দেখি ঘর থেকে ১০ মিটার দূরে আমার মা আমড়া গাছের সঙ্গে হেলে পড়ে আছেন।’


