তানিম নূর পরিচালিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ গত ঈদুল ফিতরে আলোচিত ও বাণিজ্যিকভাবে সফল চলচ্চিত্রগুলোর একটি। গত ৩০ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির আয়োজনে জেলার অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি বিশেষ প্রদর্শনী হওয়ার কথা ছিল। তবে স্থানীয় মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থীর বিরোধিতা ও হুমকির মুখে প্রদর্শনীটি বন্ধ হয়ে যায়। একই ঘটনায় কসবা উপজেলায় আরেকটি শো সাতটি পুলিশ যান মোতায়েন করে বন্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন।
প্রদর্শনীটির বিরোধিতাকারীদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ঘিরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতারা প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেন। তাদের বক্তব্য, এ ধরনের আয়োজন স্থানীয় ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং কোনো অবস্থাতেই এ প্রদর্শনী হতে দেওয়া হবে না। এ পরিস্থিতিতে তারা সতর্কতামূলক কর্মসূচিও ঘোষণা করেন।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরোধিতা ও উত্তেজনার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই অনুষ্ঠানটি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসক জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আয়োজকেরা জানান, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে ভেন্যু কর্তৃপক্ষ অনুমতি প্রত্যাহার করায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনী সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। ভেন্যু-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে গত শুক্রবার স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ মাহবুব শ্যামল ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর প্রোগ্রামটি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অতি শিগগিরই নতুন তারিখ ঘোষণা করা হবে।
এ ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১০টি সাংস্কৃতিক সংগঠন, বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ এবং সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাসহ অনেকে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
অভিনেত্রী ও আইনজীবী পিয়া জান্নাতুল টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, এটি শুধু শিল্প-সংস্কৃতির ওপর আঘাত নয়। এটি আমাদের দেশকে আফগানিস্তানের দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা বলে আমি মনে করি। সরকারকে এ ধরনের ঘটনা কঠোরভাবে দমন করতে হবে।
ঘটনার প্রতিবাদে ১ জুন আয়োজিত মানববন্ধনে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে সংস্কৃতির রাজধানী বলা হলেও সেখানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বারবার বাধার মুখে পড়ছে। তিনি অভিযোগ করেন, একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে পারিবারিক সিনেমা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রদর্শনী বন্ধ করেছে। তিনি সিনেমাটি দেখে একে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের দর্শকের জন্য উপযোগী বলে মন্তব্য করেন এবং প্রশ্ন তোলেন, এমন একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী কেন বন্ধ করা হলো।
তবে একই ইস্যুতে রুমিন ফারহানা ও প্রদর্শনীর আয়োজকদের বিরুদ্ধে সোমবার ও মঙ্গলবার মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা এ ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করেছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সোনালি সকাল’-এর সভাপতি ফাহিম মুনতাসির বলেন, সেন্সর সার্টিফিকেশন বোর্ড থেকে ছাড়পত্র পাওয়া একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী প্রশাসনের সহযোগিতায় বন্ধ হয়ে যাওয়া দুঃখজনক। তিনি আরও বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া রাষ্ট্রের আইনের বাইরে নয়। আজ যদি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধ হয়, ভবিষ্যতে গান ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রমও বাধার মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরউল্লাহ বলেন, সরকার সিনেমাবিরোধী নয়। একটি পক্ষ সিনেমা ও ধর্মকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।
চলচ্চিত্রটির পরিচালক তানিম নূর জানান, সরকার এ বিষয়ে আন্তরিক। ঈদের ছুটির কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রম কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তবে শিগগিরই ইতিবাচক সমাধান আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


