বৃষ্টির শব্দ শুনেই ঘর থেকে দৌড়ে বের হয়েছিলেন নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার রামপুরের বাসিন্দা রোমানা আক্তার। বাড়ির পাশের মাঠে চড়ছিল তার গবাদিপশু। মাঠ থেকে পশুদের ফিরিয়ে আনতে মাঠে গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু ফেরার পথে আচমকা আকাশ থেকে নেমে আসা এক ঝলক বজ্রপাতে মাঠেই লুটিয়ে পড়লেন তিনি। তার প্রাণ কেড়ে নেয় বজ্রপাত।
ঠিক একই রকম এক গ্রীষ্মের বিকালে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার দেলুয়াবাড়ি গ্রামে অন্ধকার আকাশ দেখে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন মানিক মিয়া। উদ্দেশ্য ছিল মাঠ থেকে নিজের ঘোড়াটিকে নিয়ে আসা। কিন্তু মানিকও আর ঘরে ফিরতে পারেননি; বজ্রাঘাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। রোমানা ও মানিকের বসবাসের দূরত্ব প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার হলেও, প্রকৃতির এই মরণঘাতী ছোবলে তাদের পরিণতি হয়েছে একই রকম।
চলতি গ্রীষ্মের শুরু থেকেই দেশজুড়ে বজ্রপাতের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গত মাত্র এক সপ্তাহে সারা দেশে অন্তত ৭১ জন বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, প্রকৃত সংখ্যাটি হয়তো আরও অনেক বেশি। কারণ দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মৃত্যুর খবর গণমাধ্যম কিংবা সরকারি নথিতে পৌঁছায় না।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রতি বছর দেশে গড়ে ৩৫০ জনেরও বেশি মানুষ বজ্রপাতে মারা যান। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি হিসাবে মোট ৩ হাজার ৬৫8 জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। বজ্রপাতের এই ভয়াবহতা বিবেচনা করে ২০১৫ সালে সরকার একে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে বেশ কিছু প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল থামেনি।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সাল ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ বছর, যখন ৪২৭ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কিছুটা কমে ১৭৩-এ দাঁড়ালেও এখন তা আবার বাড়তে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বজ্রপাতের তীব্রতা ও ঘনঘটা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণই এর মূল কারণ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা জানান, তাপমাত্রার ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি বজ্রপাতের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এল নিনো ও লা নিনা’র প্রভাব, সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং হঠাৎ ভারি বৃষ্টির মতো ঘটনাগুলো এই দুর্যোগের নেপথ্যে কাজ করছে।
বাংলাদেশে সাধারণত মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রঝড় সবচেয়ে বেশি হয়। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চল এবং সুনামগঞ্জ জেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। গত এক দশকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলা সবচেয়ে বিপদাপন্ন এলাকা। এই জেলায় মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ২৫টিরও বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। ভারতের খাসিয়া পাহাড় ও মেঘালয় অঞ্চলে স্তরীভূত মেঘের ঘর্ষণ এবং আদ্র পরিবেশে গরম ও ঠান্ডা বাতাসের সংমিশ্রণই এই অঞ্চলে বেশি বজ্রপাতের কারণ।
চলতি মে মাসেই সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১১ জন। যার মধ্যে একদিনেই হাওরে ধান কাটা ও হাঁস চরানোর সময় ৫ জন কৃষক ও শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় ২০২২ সালে সুনামগঞ্জের ছয়টি উপজেলায় এক কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে ১৮টি বজ্রনিরোধক দণ্ড (লাইটনিং অ্যারেস্টার) বসানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা প্রাণহানি রোধে কোনো কাজে আসছে না। ২০১৮ সালে হাওর এলাকায় তালগাছ রোপণের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তারও এখন কোনো অস্তিত্ব নেই।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, যেখানে এসব যন্ত্র বসানো হয়েছে সেখানে কৃষকরা সাধারণত যান না। এগুলো বসানো হয়েছে এমন জায়গায় যাতে প্রশাসনের লোকজন সহজে তদারকি ও ছবি তুলতে পারে। স্থানীয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই এসব স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। তিনি আরও কার্যকর পদক্ষেপ এবং জনসম্পৃক্ততার ওপর জোর দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বজ্রনিরোধক দণ্ড সাধারণত ১০০ মিটার বা ৩০০ ফুট ব্যাসার্ধের মধ্যে কার্যকর থাকে। কিন্তু বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় এই যন্ত্র দিয়ে নিরাপত্তা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। যুগ্ম সচিব গোলাম মোস্তফা জানান, বর্ষাকালে হাওরে পানির উচ্চতা ২০-৩০ ফুট পর্যন্ত বেড়ে যায়, ফলে সেখানে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত কঠিন। একটি দণ্ড বসাতে ৭ লাখ টাকা এবং আশ্রয়কেন্দ্রসহ হলে ১৫-২০ লাখ টাকা খরচ হয়। উচ্চ ব্যয়ের কারণে এখন গ্রামীণ বাজারের মতো জনবহুল স্থানে এগুলো স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১৫টি জেলায় প্রায় ৪০০টি এমন দণ্ড বসানো হয়েছে।
তবে প্রয়োজনের তুলনায় এই সংখ্যা খুবই নগণ্য। গাইবান্ধার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম জানান, অকেজো যন্ত্র মেরামত ও নতুন দণ্ড স্থাপনের জন্য তারা জরুরি ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ চেয়েছেন।
অন্যদিকে, নোয়াখালী জেলা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, পুরো জেলায় মাত্র দুটি বজ্রনিরোধক দণ্ড আছে—একটি তাদের অফিসে এবং অন্যটি হাতিয়া উপজেলা কার্যালয়ে।
বজ্রপাতের এই বাড়ন্ত হুমকি নিয়ে সম্প্রতি জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানিয়েছেন, আগামী বছর সরকার বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করবে, যাতে ফসলের মাঠে কর্মরত কৃষকরা বিপদের সময় আশ্রয় নিতে পারেন। পাশাপাশি সতর্কতামূলক সাইরেন ও টাওয়ার স্থাপনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
তবে গওহার নঈম ওয়ারা একটি মৌলিক সংকটের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, আগে বাবলা বা খেজুরের মতো গাছগুলো প্রাকৃতিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করত। এখন সেসব গাছ কেটে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে, ফলে খোলা মাঠে কৃষকরা একেবারেই অরক্ষিত হয়ে পড়ছেন। তিনি বজ্রপাত প্রতিরোধে নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা এবং উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বছরের মার্চ থেকে মে মাসে সাধারণ মানুষকে বজ্রপাত থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক।


