ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বাস্তবতায় পুরনো ইস্যুগুলোতে পাল্টাপাল্টি প্রচারণার কারণে দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কে আবারও অবনতি হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই দলের প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময়ের সুসম্পর্ক এখন শত্রুতায় পরিণত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা এটিকে ক্ষমতার রাজনীতিতে বাস্তবতা উল্লেখ করে বলছেন, আজ যে বন্ধু, কাল সে শত্রু হতে পারে। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দল দুটির উচিত ছিল অতীত নিয়ে টানাটানি না করে দেশের জন্য নিজেদের পরিকল্পনা সামনে নিয়ে আসা।
গত কয়েকদিনে বিএনপিকে টার্গেট করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর চাঁদাবাজি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে জামায়াত সমমনারা জোরালো প্রচারণা শুরু করে। এরপর ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকাকে বিএনপি সামনে আনার পর দল দুটির বিরোধ এখন তুঙ্গে।
দলগুলোর নেতারা বলছেন, গত সপ্তাহে জামায়াতসহ সমমনা ৮ দলের বিভাগীয় সমাবেশে দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বিএনপির চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরেন এবং দলটিকে নির্বাচনে বয়কটের আহ্বান জানান। ওইসব সমাবেশে প্রচার করা হয়, বিএনপি নব্য ফ্যাসিস্ট হতে চায় এবং সংস্কার চায় না, তাই তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের ‘হ্যাঁ’-এর বিরুদ্ধে।
এমন অবস্থায় রোববার ভার্চ্যুয়ালি একটি অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘যারা তাদেরকে (জামায়াত) একবার দেখতে বলেন, তাদেরকে মনে রাখতে হবে ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী কী কী করেছে। তারা শুধু লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেনি, মা-বোনের ইজ্জত কীভাবে লুট করেছিল, আমাদের মনে রাখতে হবে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এখন যা চলছে, সেটি ক্ষমতাকেন্দ্রিক। এটি অস্বাভাবিক না হলেও আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে বিশেষ বার্তা দিচ্ছে। কারণ, কর্মীরা পরস্পর বিরোধী অবস্থানে এমন জায়গায় যাচ্ছে যে সংঘাত ও সহিংসতা অনিবার্য হতে পারে।
তারেক রহমানের ওই বক্তব্যের পর থেকে দলটির নেতাকর্মীরা জামায়াতকে আক্রমণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সোমবার এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের ব্যাপক সমালোচনা করে বলেন, ‘একটা দলের নীতি আদর্শ পরিকল্পনা নেই, আছে শুধু ধর্মের নামে ট্যাবলেট বিক্রি। আমরা ধর্মের ট্যাবলেট বিক্রি করতে চাই না।’
অন্যদিকে জামায়াতও বসে নেই। সোমবার দুপুরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঢাকাস্থ দূতাবাসে ৮ দেশের দূতদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানও বিএনপির নেতাদের বক্তব্যের জবাব দেন।
তিনি বলেন, ‘জামায়াত ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করে না বা ব্যবসা করে না। যারা নির্বাচনের সময় এলে তসবিহ নিয়ে ঘুরে, তারাই ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে। জামায়াত দুর্নীতির বিরুদ্ধেই থাকবে।’
এদিকে, জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগের নানা ভিডিও-অডিও প্রচারে নেমেছে। তারা বিগত বিএনপি সরকারের সময়ের অনিয়ম ও দুর্নীতির পেপার কাটিং প্রচারে ব্যস্ত। ইসলামী দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বলছেন, তারা আগামী নির্বাচনে চাঁদাবাজির শিকার পরিবারগুলোকে কাজে লাগাতে চান।
অপরদিকে, বিএনপি ‘৭১-এর চেতনাকে সামনে আনতে চায়। তারা দেখাতে চায় যে, সরকার পতনের পর ইসলামী দলগুলোর অনেকে মুক্তিযোদ্ধাকে অস্বীকার করেছেন এবং তারা ক্ষমতায় গেলে দেশে মৌলবাদী শাসন ব্যবস্থা চালু হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেন, ‘প্রায় দুই যুগের সুসম্পর্ক থাকার পরও বিএনপি ও জামায়াতের ক্ষমতায় যাওয়া নিয়ে বর্তমান শত্রুতা গতানুগতিক রাজনীতিকে ফের মনে করিয়ে দিচ্ছে। বিএনপির বিরুদ্ধে অনিয়ম এবং জামায়াতের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে বিতর্কিত ভূমিকা থাকার পরও ক্ষমতার ইস্যুতে তারা একসঙ্গে ছিল। এখন এই ইস্যুতে বিরোধ চলছে।’
১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জামায়াতসহ ৪ দলের সঙ্গে জোট গঠন করেন। এরপর নানা চড়াই উৎরায় পেরিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন সময়েও দল দুটির সুসম্পর্ক ছিল।
এখন আওয়ামী লীগ রাজনীতির বাইরে থাকায় আগামী নির্বাচনে দল দুটি পৃথক জোট গঠন করে নামছে, যে কারণে তারা এখন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী।


