ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ নাব্যতা সংকটে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ফুলছড়ি লটঘাটে নৌচলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় এই নৌ-চ্যানেল দিয়ে কোনো নৌযান চলাচল করতে পারছে না। ফলে চরাঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও স্থবিরতা নেমে এসেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, একসময় যেখানে ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে ঢেউ খেলত, সেখানে এখন দিগন্তজুড়ে বিস্তীর্ণ বালুচর। পুরাতন ফুলছড়ি উপজেলা পরিষদের সামনের এলাকা থেকে শুরু করে চারদিকে চোখ যতদূর যায়, কেবল ধুধু বালু আর বালু। নদীপথে নৌকার সারি, মাঝিদের হাঁকডাক কিংবা যাত্রীদের ভিড়-সবই এখন অতীতের স্মৃতি। এক সময়ের কোলাহলমুখর ঘাট আজ নীরব ও জনশূন্য।
নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন এরেন্ডাবাড়ী, ফুলছড়ি ও ফজলুপুরসহ চরাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ। দৈনন্দিন প্রয়োজন, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা বাজার করতে এখন তাদের মাইলের পর মাইল তপ্ত বালুচর পায়ে হেঁটে পার হতে হচ্ছে।
বিশেষ করে সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার বসা ঐতিহ্যবাহী পুরাতন ফুলছড়ি হাটে যাতায়াত এখন চরম ভোগান্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে যেখানে নৌকায় অল্প সময়েই হাটে পৌঁছানো যেত, এখন সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করে হেঁটে যেতে হচ্ছে।
দেলুয়াবাড়ি চরের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আগে নৌকায় খুব সহজেই হাটে যাতায়াত করতাম। এখন দুই থেকে তিন কিলোমিটার বালুচর হেঁটে পার হতে হয়। বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য এটি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেকেই মাঝপথে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

নাব্যতা সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। চরাঞ্চলের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল হাটে নিতে গিয়ে চরম সমস্যায় পড়ছেন। ফলে তারা ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
বাজে ফুলছড়ি এলাকার কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে নৌকায় সহজেই পণ্য হাটে নিয়ে আসতাম। এখন সেই সুযোগ নেই। বালুচর পেরিয়ে মালামাল আনা খুব কষ্টকর, খরচও বেশি।
একই এলাকার কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, আগে ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে ঢাকা ও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই নৌপথ ব্যবহার করে দ্রুত বাড়ি ফিরতে পারতেন। এখন সেই ব্যস্ত নৌঘাট একেবারে খাঁ খাঁ করছে।
অন্যদিকে, নদীতে পানি না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নৌকার মাঝি ও শ্রমজীবী মানুষ। ফুলছড়ি লটঘাটের ফেরি নৌকার মাঝি আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, একসময় এই ঘাট দিয়ে প্রতিদিন শতশত মানুষ পারাপার হতো। কয়েকশত নৌকা চলাচল করত। এখন পানির অভাবে ৬২টি নৌকা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে আছে। আমাদের কোনো আয় নেই, পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন কাটছে।
ফুলছড়ি উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শুক্কুর আলী ফিরোজ বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্র নদের এই চ্যানেলে পানি না থাকায় পুরো চরাঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নৌযোগাযোগ বন্ধ থাকায় কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’
স্থানীয়দের দাবি, ব্রহ্মপুত্র নদের নাব্যতা রক্ষায় দ্রুত ড্রেজিংসহ কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা আরও বড় সংকটে পড়বে। সংকটের এই চিত্র শুধু যাতায়াত ব্যবস্থাকেই পঙ্গু করেনি, বরং শত শত শ্রমজীবী পরিবারের ভবিষ্যৎকে করে তুলেছে অনিশ্চিত। নদীর চিরচেনা কোলাহল এখন স্তব্ধ; তার জায়গায় প্রতিদিন শোনা যাচ্ছে বালুচর পেরিয়ে চলা মানুষের দীর্ঘশ্বাস।


