এক যুগেরও বেশি সময় আগে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যার ঘটনায় পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক ৩১ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ আমলে নিয়ে সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ দেয়। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার থাকা ১০ আসামিকে পরবর্তী শুনানিতে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৬ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, মামলায় দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে ৩২ জনকে হত্যার ঘটনা এবং দ্বিতীয় অভিযোগে ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ‘জেনোসাইড’ আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, এটি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অভিযানের আগে মন্ত্রী ও প্রশাসনের একটি বৈঠকে গ্রেনেড ও মারণাস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শিশুসহ হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের হত্যা করা হয় বলে আদালতে অভিযোগ উপস্থাপন করেন তিনি।
এ মামলায় গ্রেপ্তার ও অন্য মামলায় কারাগারে থাকা ১০ আসামি হলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, র্যাবের সাবেক গোয়েন্দা পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, সাংবাদিক মোজাম্মেল হক বাবু এবং সাংবাদিক ফারজানা রুপা।
পলাতক ৩১ আসামি হলেন শেখ হাসিনা, মহিউদ্দিন খান আলমগীর, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মাহবুবউল আলম হানিফ, হাসান মাহমুদ চৌধুরী, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, মৃণাল কান্তি দাস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, ওমর ফারুক চৌধুরী, সালাউদ্দিন মাহমুদ ওরফে এস এম জাহিদ, ইমরান এইচ সরকার, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক বিজিবি মহাপরিচালক আজিজ আহমেদ, লে. জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, মাহবুব হোসেন, মো. মনিরুল ইসলাম, মো. আনোয়ার হোসেন, আশরাফুজ্জামান, এস এম মেহেদী হাসান, মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, মো. আসাদুজ্জামান, এস এম শিবলী নোমান এবং বিএম ফরমান আলী।
পরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, হেফাজতে ইসলামকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে তৎকালীন সরকারের নির্দেশনায় পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সমন্বিতভাবে হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করে।
তিনি বলেন, ঘটনার পর দায়ের করা মামলার কোনো কার্যকর তদন্ত হয়নি এবং বহু চেষ্টা সত্ত্বেও হেফাজতে ইসলাম এ হত্যাকাণ্ডের বিচার পায়নি।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রসিকিউশন মামলাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত সম্পন্ন করেছে। তার দাবি, শিশুসহ আলেম-ওলামাদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল এবং ঘটনাটি ছিল গণহত্যা।
সকালে প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করলে দীর্ঘ তদন্ত শেষে মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। তদন্তকারী সংস্থা সাক্ষ্য-প্রমাণ, ভিডিওচিত্র, আলোকচিত্র, বিভিন্ন নথি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। পরে সেটি যাচাই-বাছাই শেষে প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে।
প্রসিকিউশনের দাবি, তদন্তে শাপলা চত্বরকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিহত ৫৮ জনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৩২ জন, নারায়ণগঞ্জে ২০ জন, চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লায় একজন নিহত হন।
শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ প্রথমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে দায়ের করেন হেফাজতে ইসলামের নেতা আজিজুল হক। তিনি হেফাজতের নেতা জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষে অভিযোগটি দাখিল করেন। প্রাথমিক অভিযোগে ২১ জনকে আসামি করা হলেও তদন্ত শেষে প্রসিকিউশন আসামির সংখ্যা বাড়িয়ে ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে।


