বৃষ্টিস্নাত শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় সিক্ত হলেন প্রখ্যাত লালন সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন। রোববার বেলা ১২টার দিকে প্রয়াত শিল্পীর মরদেহ রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হয়।
এ সময় বরেণ্য শিল্পীকে শেষ বিদায় জানাতে শিল্পাঙ্গনের পাশপাশি ঢল নামে সাধারণ মানুষের। বৃষ্টিতে ভিজেই তারা ফুলেল শ্রদ্ধায় বিদায় জানান ফরিদা পারভীনকে।
শিল্পীর ছেলে ইমাম নাহিল সুমন সাংবাদিকদের জানান, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে ফরিদা পারভীনে মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে রাখা হবে। সেখানে বাদ যোহর জানাজা শেষে কুষ্টিয়ায় মা–বাবার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে।

ইমাম নাহিল বলেন, ‘মাকে কুষ্টিয়ায় দাফন করব, তার ইচ্ছা অনুযায়ী। পৌর কবরস্থানে দাফন হবে।’
দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন ফরিদা পারভীন। সম্প্রতি তার আরো অবনতি হলে তাকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হতো। গত ২ সেপ্টেম্বর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ ডায়ালাইসিসের পর তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়।

তখন চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউতে) ভর্তি করার পরামর্শ দেন। পরে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। সেখানেই শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে মারা যান তিনি ।
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া থানায় জন্মগ্রহণ করা ফরিদা পারভীন সংগীত জীবনে কাটিয়েছেন প্রায় ৫৫ বছর। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ১৯৬৮ সালে তার সংগীতজীবন শুরু হয়। তার সংগীত জীবনের প্রথম দিকটি ছিল নানা সংগ্রাম ও চড়াই-উতরাইয়ে ভরা। তবে পারিবারিক পরিবেশের কারণে, বিশেষ করে বাবার সংগীতপ্রেমের হাত ধরে গানের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার শৈশব কাটে বিভিন্ন স্থানে। কারণ, বাবার চাকরি তাকে নানা জায়গায় নিয়ে যেতে হয়েছিল। মাগুরায় থাকাকালীন সময়ে তিনি সংগীতের প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে।

ফরিদা পারভীনের সংগীত জীবনের মাইলফলক ছিল লালন সাঁইয়ের গান গাওয়া। এক সময় কুষ্টিয়ায় এক হোমিও চিকিৎসক তার কণ্ঠে লালনগীতি শুনতে আগ্রহী ছিলেন। এই পরামর্শের পর তিনি লালন সাঁইয়ের গান শেখা শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে তিনি লালনের গান গাইতে চাইতেন না, তবে বাবার উৎসাহে এবং পরে মকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে তালিম নিয়ে তিনি লালন সাঁইয়ের গানে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।
তার সংগীত জীবনে বহু স্মরণীয় মুহূর্ত রয়েছে, যার মধ্যে ১৯৭৩ সালের এক ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে, যখন তিনি ঢাকায় এসে রেডিওতে লালনের গান রেকর্ড করেন। এই অনুষ্ঠানটি সংগীত জগতে তার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল।

ফরিদা পারভীন গানের মাধ্যমে একদিকে যেমন লালনের আধ্যাত্মিক দর্শনকে সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছেন, তেমনি তার আধুনিক গানের মাধ্যমে শ্রোতাদেরও মুগ্ধ করেছেন। লালন সাঁইয়ের গান গেয়ে তিনি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, বিশেষ করে জাপান, সুইডেন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশে। তার অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদক ও ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।
বাঙালি সংগীতাঙ্গনে ফরিদা পারভীনের অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


