সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে থোকা থোকা আঙুর। কোনোটি কুচকুচে কালো, কোনোটি টুকটুকে লাল, আবার কোনোটি হালকা সবুজ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো আঙুর বাগান। তবে চারপাশের চিরচেনা গ্রামীণ পরিবেশ মনে করিয়ে দেয়, এটি বাংলাদেশেরই এক টুকরো মাটি। এটি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার কুঠি পাঁচুরিয়া গ্রামের দৃশ্য।
“বাংলাদেশের মাটিতে মিষ্টি আঙুর হয় না” এমন প্রচলিত ধারণাকে স্রেফ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন গোয়ালন্দের এক তরুণ ফারদিন আহমেদ। পেশায় তিনি রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ার হলেও নেশায় একজন পুরোদস্তুর কৃষক। আর সেই নেশাই এখন তাকে এনে দিয়েছে ঈর্ষণীয় বাণিজ্যিক সাফল্য। গোয়ালন্দের দেড় বিঘা জমিতে ২০৪ জাতের আঙুর চাষ করে তিনি এখন শুধু রাজবাড়ী নয়, সারা দেশের কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য এক পরম বিস্ময়।
ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়া ফারদিনের এই যাত্রার শুরুটা অবশ্য খুব একটা সহজ ছিল না। ২০২০ সালে করোনা মহামারীর এক দমকা হাওয়ায় যখন ঢাকার সব কোচিং সেন্টার বন্ধ হয়ে যায়, তখন চার দেয়ালের বন্দিজীবন ছেড়ে তিনি ফিরে আসেন গোয়ালন্দের ছোটভাকলা ইউনিয়নের কুঠি পাঁচুরিয়া গ্রামের মোল্লাপাড়ায়। গ্রামের বাড়িতে এসে সময় কাটানোর জন্য শখ করে উঠানে একটি আঙুর গাছ লাগিয়েছিলেন তিনি। কিছুদিন পর গাছটিতে ফলনও এসেছিল, কিন্তু সেই আঙুর মুখে দেওয়ার কোনো উপায় ছিল না। টক আর কড়া স্বাদের কারণে তা খাওয়ার একদমই অযোগ্য ছিল না।
শুরুর এই অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর ছিল না। তবে ফারদিন দমে যাওয়ার পাত্র নন। প্রাতিষ্ঠানিক কৃষি শিক্ষা না থাকলেও মেধা আর ইন্টারনেটকে পুঁজি করে তিনি শুরু করেন ব্যক্তিগত গবেষণা। নিবিড়ভাবে ইউটিউব এবং ইন্টারনেটে বিদেশি আঙুর চাষের বিভিন্ন ব্লগ ও কনটেন্ট দেখে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। কোন সময়ে কী ধরনের সার দিতে হয়, কিংবা আঙুর গাছের বিশেষ পরিচর্যা পদ্ধতি কী—তা আয়ত্তে এনে বাড়ির পাশেই গড়ে তোলেন ‘গ্রেপ ইঞ্জিনিয়ারিং এগ্রো অ্যান্ড রিসার্চ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ গবেষণার পর ২০২৫ সালের মে মাসে দেড় বিঘা জমিতে শুরু করেন বাণিজ্যিক চাষ। দেশ-বিদেশ থেকে হরেক রকমের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করেন প্রায় ৫০০টি গাছ। এ পর্যন্ত তার মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টাকা।
বর্তমানে ফারদিনের সেই বাগানে দোল খাচ্ছে রাশিয়ার বিখ্যাত ‘বাইকোনুর’, ইউক্রেনের ‘ভ্যালেজ’, জাপানের ‘রুবিরোমান’, ল্যাম্বরগিনি এবং ব্ল্যাক ম্যাজিকসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ২০৪ জাতের আঙুর। আধুনিক ‘মাচা’ পদ্ধতি ব্যবহার করে এবং মাটি ও আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তিনি প্রমাণ করেছেন, সঠিক পরিচর্যা ও সঠিক জাত নির্বাচন করলে এ দেশেও বিশ্বমানের মিষ্টি আঙুর উৎপাদন সম্ভব।
নিজের বাগান সাজানোর পাশাপাশি ফারদিন এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আগ্রহী কৃষকদের জন্য চারা উৎপাদন করছেন। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ছে তার সংগৃহীত বিদেশি জাতের চারা। আঙুর বিক্রির পাশাপাশি এই চারা বিক্রি থেকেও তার ঘরে আসছে বড় অঙ্কের আয়।
ফারদিনের এই ‘গ্রেপ ইঞ্জিনিয়ারিং’ বাগান দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে ভিড় করেন। আঙুরের থোকা দুলতে থাকা এই বাগানকে ঘিরে ভবিষ্যতে একটি চমৎকার ‘রিসোর্ট’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার। যেখানে মানুষ এসে প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানোর পাশাপাশি সরাসরি বাগান থেকে সতেজ আঙুর সংগ্রহ করতে পারবেন।
ফারদিন আহমেদ জানান, মূলত সময় কাটানোর জন্য শখের বশে বাড়ির উঠানে একটি আঙুর গাছ লাগিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রথম অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো ছিল না; ফলন আসলেও সেগুলো খাওয়ার যোগ্য ছিল না। কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। গবেষণার মাধ্যমে শিখে ফেলেন কাংলাদেরে মাটিতে মিষ্টি আঙুর ফলানোর কৌশল।
তবে সরকারি সহযোগিতা নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ প্রকাশ করেন ফারদিন। জানান, এই দীর্ঘ যাত্রায় এখন পর্যন্ত কৃষি বিভাগ থেকে কোনো ধরণের প্রযুক্তিগত সহায়তা বা পরামর্শ পাওয়া যায়নি। পুরোপুরি নিজের চেষ্টা এবং ইন্টারনেটের তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই বাগানটি গড়ে তোলা হয়েছে।
ফারদিন বলেন, ‘শুরুতে অনেকেই আমার এই উদ্যোগ দেখে হাসাহাসি করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন বাংলাদেশের মাটিতে মিষ্টি আঙুর হওয়া অসম্ভব। কিন্তু প্রথম বছরই যখন চমৎকার ফলন এল এবং আঙুরগুলো স্বাদে বেশ মিষ্টি হলো, তখন সেই মানুষগুলোই এখন গর্ববোধ করছেন।”
এই স্বপ্নবাজ তরুণ জানান, বাণিজ্যিক চাষে প্রথমবারের সাফল্য দেখে আরও সাড়ে ৪ বিঘা জমিতে ‘বাইকোনুর’ জাতের আঙুর চাষ শুরু করেছেন। তিনি মনে করেন, যথাযথ বাণিজ্যিক পরিকল্পনা থাকলে এই খাতে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।
ফারদিনের এই সাফল্য শুধু তার নিজের ভাগ্য বদলায়নি, বরং স্থানীয় মানুষ ও দর্শনার্থীদের মনেও এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। স্থানীয় কৃষক আঃ রহিম জানান, ফারদিন আঙুর চাষ নিয়ে এখানকার মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে। তার পরামর্শ নিয়ে আগামী অল্প কিছু জমিতে আঙুর চাষ করবেন বলেও জানান আঃ রহিম।
ফরিদপুর থেকে বাগান দেখতে আসা তরুণ দর্শনার্থী আশরাফুল ইসলাম বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় ফারদিনের বাগানের ভিডিও দেখে কুঠি পাঁচুরিয়া গ্রামে এসেছি। এখানে এসে ২০৪ জাতের আঙুর দেখে আমি সত্যিই অভিভূত। বিশেষ করে ল্যাম্বরগিনি বা ব্ল্যাক ম্যাজিকের মতো বিদেশি জাতগুলো আমাদের দেশের আবহাওয়ায় এতো সুন্দরভাবে ফলানো সম্ভব, তা এখানে না আসলে বিশ্বাস হতো না।”
গাছের সতেজ আঙুর দেখে মুগ্ধ গৃহিণী ও সৌখিন বাগানপ্রেমী শাহনাজ পারভীন বলেন, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হতো না যে রাজবাড়ীর মাটিতে এত সুন্দর আর বড় বড় আঙুর হতে পারে! গাছের সতেজ আঙুর ডাল থেকে ঝুলে আছে—এই দৃশ্য দেখেই মন ভরে গেছে।
কৃষি বিষয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান এটিকে দেখছেন একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হিসেবে। তিনি বলেন, “সাধারণত আমাদের ধারণা বাংলাদেশের আবহাওয়ায় আঙুর মিষ্টি হয় না। কিন্তু ফারদিন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ২০৪টি জাতের যে বিশাল সংগ্রহ গড়ে তুলেছেন, তা আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য একটা বড় শিক্ষা। বিশেষ করে ল্যাম্বরগিনি বা ব্ল্যাক ম্যাজিকের মতো বিশ্বখ্যাত জাতগুলো এখানে সফলভাবে ফলানো দেখে আমি অভিভূত।”
পরিবারের প্রিয় মানুষের এমন অভাবনীয় কীর্তিতে গর্বিত ফারদিনের ভাবি সুফিয়া খাতুন বলেন, “এই প্রথম আমি কোনো আঙুর বাগান দেখছি, যেখানে থোকায় থোকায় আঙুর ঝুলছে। দেখেই মন ভরে যাচ্ছে আমাদের। দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই এ বাগান দেখতে আসছে, তারা আঙুর ফলের চারা সংগ্রহ করছে।”
ফারদিনের এই উদ্যোগ স্থানীয় বেকার মানুষের জন্যও আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। বাগানে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থান। বাগানের পরিচর্যাকর্মী শহীদ মিয়া জানান, ফারদিনের এই আঙুর বাগানে ১০/১২ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে।
রাজবাড়ীর এই তরুণ উদ্যোক্তার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য নিয়ে ইতিবাচক মত প্রকাশ করেছেন রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে বিদেশি জাতের আঙুর চাষ হচ্ছে এবং তাতে সফল হওয়া যাচ্ছে- এটি কৃষি খাতের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি খবর।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া যে আঙুর চাষের জন্য উপযোগী, তা এই বাগানের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হয়েছে। কৃষি বিভাগ এই উদ্যোক্তার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানান শহিদুল ইসলাম।


