প্রখ্যাত লালনসংগীত শিল্পী ফরিদা পারভীনের মরদেহ রোববার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা নাগাদ ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেষশ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে।
এদিন বেলা ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে তার মরদেহ নেওয়া হবে কুষ্টিয়ায়। সেখানে জানাজা শেষে বাবা মায়ের কবরের পাশে শেষশয্যা হবে শিল্পীর।
ফরিদা পারভীনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। শনিবার এক শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নজরুলগীতি, দেশাত্মবোধক নানা ধরনের গান করলেও শ্রোতাদের কাছে ফরিদা পারভীনের পরিচিতি “লালনকন্যা” হিসেবে। পাঁচ দশক ধরে তার কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের গান মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে। তার গান আমাদের সংস্কৃতির অন্তর্লীন দর্শন ও জীবনবোধকেও নতুন মাত্রায় তুলে ধরেছিল।’
প্রধান উপদেষ্টা লোকসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীনের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
পৃথক শোকবার্তায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দেশের বরেণ্য লোকসঙ্গীত শিল্পী ফরিদা পারভীনের ইহধাম ত্যাগে সঙ্গীতজগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। এতে লোকসঙ্গীত ও সংস্কৃতির ভুবনে এক বিশাল শুন্যতার সৃষ্টি হলো।’
দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন ফরিদা পারভীন। সম্প্রতি তার আরো অবনতি হলে তাকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হতো। গত ২ সেপ্টেম্বর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ ডায়ালাইসিসের পর তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়। তখন চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউতে) ভর্তি করার পরামর্শ দেন। পরে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। সেখানেই শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে মারা যান তিনি ।

১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া থানায় জন্মগ্রহণ করা ফরিদা পারভীন সংগীত জীবনে কাটিয়েছেন প্রায় ৫৫ বছর। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ১৯৬৮ সালে তার সংগীতজীবন শুরু হয়। তার সংগীত জীবনের প্রথম দিকটি ছিল নানা সংগ্রাম ও চড়াই-উতরাইয়ে ভরা। তবে পারিবারিক পরিবেশের কারণে, বিশেষ করে বাবার সংগীতপ্রেমের হাত ধরে গানের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার শৈশব কাটে বিভিন্ন স্থানে। কারণ, বাবার চাকরি তাকে নানা জায়গায় নিয়ে যেতে হয়েছিল। মাগুরায় থাকাকালীন সময়ে তিনি সংগীতের প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে।
ফরিদা পারভীনের সংগীত জীবনের মাইলফলক ছিল লালন সাঁইয়ের গান গাওয়া। এক সময় কুষ্টিয়ায় এক হোমিও চিকিৎসক তার কণ্ঠে লালনগীতি শুনতে আগ্রহী ছিলেন। এই পরামর্শের পর তিনি লালন সাঁইয়ের গান শেখা শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে তিনি লালনের গান গাইতে চাইতেন না, তবে বাবার উৎসাহে এবং পরে মকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে তালিম নিয়ে তিনি লালন সাঁইয়ের গানে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।
তার সংগীত জীবনে বহু স্মরণীয় মুহূর্ত রয়েছে, যার মধ্যে ১৯৭৩ সালের এক ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে, যখন তিনি ঢাকায় এসে রেডিওতে লালনের গান রেকর্ড করেন। এই অনুষ্ঠানটি সংগীত জগতে তার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল।
ফরিদা পারভীন গানের মাধ্যমে একদিকে যেমন লালনের আধ্যাত্মিক দর্শনকে সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছেন, তেমনি তার আধুনিক গানের মাধ্যমে শ্রোতাদেরও মুগ্ধ করেছেন। লালন সাঁইয়ের গান গেয়ে তিনি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, বিশেষ করে জাপান, সুইডেন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশে। তার অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদক ও ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।
বাঙালি সংগীতাঙ্গনে ফরিদা পারভীনের অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


